আজকের দিনে সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক বা পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতেই অনেকের নজর চলে যায় নিজের রাশিফলের ওপর। ‘আজ আপনার লটারি জেতার যোগ আছে’ কিংবা ‘আজ প্রিয় মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে’–এমন কথা পড়ে মনে মনে একটু রোমাঞ্চ বা দুশ্চিন্তা কাজ করাটা খুব স্বাভাবিক।
তরুণ প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই হরোস্কোপ বা রাশিফল নিয়ে এক ধরনের অদ্ভুত কৌতূহল কাজ করে। কেউ এটাকে স্রেফ বিনোদন মনে করে উড়িয়ে দেয়, আবার কেউ হয়তো দিনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার রাশির পূর্বাভাস মিলিয়ে নেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই হরোস্কোপ আসলে কী? এর পেছনে কি কোনো বিজ্ঞান আছে, নাকি এটি শুধুই এক ধরনের মানসিক মনস্তত্ত্ব?
হরোস্কোপ কি এবং এর পথচলা কীভাবে শুরু?
খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হরোস্কোপ হলো একজন মানুষের জন্মের সুনির্দিষ্ট সময়ে মহাকাশে সূর্য, চন্দ্র এবং বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান কেমন ছিল, তার একটি মানচিত্র বা চিত্ররূপ। জ্যোতিষশাস্ত্রের (Astrology) মতে, এই গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান মানুষের চরিত্র, মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে।
এই হরোস্কোপের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো। আজ থেকে প্রায় হাজার চারেক বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলন ও মেসোপটেমিয়ায় এই চর্চার সূত্রপাত হয়েছিল। প্রাচীনকালের মানুষ যখন রাতের আকাশে তারার মেলা দেখত, তখন তারা ঋতু পরিবর্তন বা কৃষিকাজের সুবিধার জন্য নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত। পরবর্তী সময়ে প্রাচীন গ্রিক, রোমান, মিশরীয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে এটি সংস্কৃতির একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রিক শব্দ ‘হরোস্কোপোস’ (Horoskopos) থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ ‘সময়ের পর্যবেক্ষণ’।

হরোস্কোপ কীভাবে কাজ করে (দাবি বনাম বাস্তব)?
জ্যোতিষীদের দাবি অনুযায়ী, পুরো আকাশমণ্ডলকে ১২টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যা ‘রাশিচক্র’ (Zodiac) নামে পরিচিত। মেষ, বৃষ, মিথুন থেকে শুরু করে মীন পর্যন্ত এই ১২টি রাশির একেকটির ওপর আরেকটি গ্রহের প্রভাব থাকে। বলা হয়ে থাকে, আপনার জন্মের সময় সূর্য যে রাশিতে অবস্থান করছিল, সেটাই আপনার মূল রাশি বা ‘সান সাইন’ (Sun Sign)।
তবে মজার বিষয় হলো, হরোস্কোপ যেভাবে আমাদের মনে জায়গা করে নেয়, তার পেছনে গ্রহ-নক্ষত্রের চেয়ে বেশি কাজ করে মানুষের মনস্তত্ত্ব। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘বারনাম ইফেক্ট’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো মানুষের সামনে এমন কিছু সাধারণ ও অস্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরা হয় যা প্রায় সবার জীবনের সঙ্গেই মিলে যায়, তখন মানুষ মনে করে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে কেবল তার জন্যই বলা হয়েছে। যেমন- যদি বলা হয়, ‘আপনি বাইরে থেকে খুব শক্ত হলেও ভেতরে ভেতরে বেশ আবেগপ্রবণ’–এই বাক্যটি পৃথিবীর ৮০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই সত্যি! হরোস্কোপ মূলত এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলেই মানুষের অবচেতনে কাজ করে।
হরোস্কোপের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে?
একদম সোজাসুজি উত্তর দিলে–না, হরোস্কোপ বা জ্যোতিষশাস্ত্রের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি ‘ছদ্মবিজ্ঞান’ বা Pseudo-science।
মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, রাশিচক্রের নক্ষত্রমণ্ডলগুলো পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই দূরবর্তী নক্ষত্র বা গ্রহগুলোর মহাকর্ষীয় বল এতটাই দুর্বল যে, তা পৃথিবীর কোনো নবজাতকের চরিত্র বা ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। বিজ্ঞানের যুক্তি হলো, একই দিনে একই সময়ে জন্ম নেওয়া দুটি যমজ শিশুর জীবন ও ভাগ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। তাই নক্ষত্রের অবস্থান দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ বলে দেওয়াটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়।

তা হলে কি বিশ্বাস করব, নাকি করব না?
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, বিজ্ঞান যখন একে স্বীকৃতি দেয় না, তখন মানুষ কেন এতে বিশ্বাস করে? আসলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা জানার এক ধরনের আদিম কৌতূহল মানুষের জন্মগত। পরীক্ষা কেমন হবে, ক্যারিয়ারে কী অপেক্ষা করছে, কিংবা পছন্দের মানুষটি তাকে ভালোবাসে কি না–এসব দোলাচলের মাঝে হরোস্কোপ যখন একটু ইতিবাচক আশার বাণী শোনায়, তখন মনটা হালকা হয়।
তরুণদের জন্য পরামর্শ হলো, হরোস্কোপকে আপনি যদি সকালের এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নেন, তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। একটা পজিটিভ প্রেডিকশন যদি আপনার সারা দিনের কাজের অনুপ্রেরণা দেয়, তবে সেটাকে ভালো মনে করতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা তখন হয়, যখন মানুষ এর ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাশিফলে ‘আজ যাত্রা অশুভ’ দেখে যদি কেউ ইন্টারভিউ দিতে না যায়, কিংবা ‘আজ সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারে’ ভেবে যদি বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে–তবে সেটা হবে চরম বোকামি।
নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ো
তারুণ্যের মূল শক্তিই হলো আত্মবিশ্বাস আর যুক্তি দিয়ে পৃথিবীকে চেনা। গ্রহ-নক্ষত্র বা রাশিফলে দেওয়া চার লাইনের ভবিষ্যদ্বাণী কখনই আপনার যোগ্যতা বা পরিশ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নির্ভর করে আমাদের আজকের কর্ম, সঠিক সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং কঠোর অধ্যবসায়ের ওপর। তাই হরোস্কোপের পাতায় নিজের ভাগ্য না খুঁজে, নিজের শক্তির ওপর ভরসা রাখাই একজন তরুণের আসল পরিচয়। বিনোদনের ছলে রাশিফল পড়ুন, হাসুন, কিন্তু নিজের জীবনের স্টিয়ারিংটা সব সময় নিজের হাতেই রাখুন!