‘চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার ওসিকে চাঁদা তুলে প্রতিমাসে দুই লাখ টাকা দিতে হয়’ বলে স্বীকার করেছেন ওসির আস্থাভাজন পুলিশের ‘ক্যাশিয়ার’ নামে খ্যাত পাইন্দংয়ের বাসিন্দা মো. সাদ্দাম হোসেন।
চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক দিয়ে গাছ, বাঁশ, বালু কিংবা মাটি পরিবহনের ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। চালকদের অভিযোগ, পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে চাঁদা দেন তারা।
জানা গেছে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দেশের পট পরিবর্তনের আগে সাদ্দাম পুলিশের অধীনে মাসিক বেতনে কাজ করতেন। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের পর ওসির ‘লাইন’ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। পরে পুলিশের কথিত ক্যাশিয়ার সাদ্দামের সঙ্গে মাসিক দুই লাখ টাকায় একটি অলিখিত চুক্তি হয় ওসির। ‘সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহন থেকে চাঁদার ভাগ প্রতিমাসের ১৫ তারিখের মধ্যে ওসিকে বুঝিয়ে দিতে হয়’- এমন স্বীকারোক্তি সাদ্দামের। যা ভিডিও স্বীকারোক্তি হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
এ ছাড়াও সাদ্দাম প্রশাসনের হর্তার্কতা, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাকে দেন মাসোহারা। সাদ্দামের দাবি, ‘পুরো কর্মটি পরিচালিত হয় ফটিকছড়ি থানার ওসি মুহাম্মদ সেলিমের তত্ত্বাবধানে’।
স্থানীয় সুত্র জানায়, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত গাছ, বাঁশের গাড়ি যাতায়াত করে। এ ছাড়াও পাইন্দং- কাঞ্চননগর সড়ক, ফটিকছড়ি-হেয়াকো সড়ক, পেলাগাজী-বারৈয়ারঢালা সড়ক ও লেলাং-রাঙামাটিয়া সড়ক দিয়ে গাছ ও বাঁশের জন্য গাড়িপ্রতি এক হাজার টাকা দিতে হয় পুলিশের ক্যাশিয়ারকে।
জায়গা ভরাট ও মাটি কাটা, বালু উত্তোলনের প্রতিটি স্পট থেকে প্রতিমাসে ৫ হাজার করে ‘ওসির লাইনের’ টাকা উত্তোলন করেন সাদ্দাম। এছাড়া বালু-মাটি পরিবহনে এক মাসের জন্য প্রতি গাড়ি এক হাজার টাকা করে দিতে হয় গাড়ির কোম্পানিকেও। এভাবে চাঁদাবাজি করেন সাদ্দাম।
প্রতিমাসে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা চাঁদা উত্তোলন করেন সাদ্দাম। এ টাকার দুই লাখ যায় ওসির পকেটে। বন বিভাগ ও তাদের বিশেষ টহল টিম, আইশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকরাও পান ভিন্ন অংকের টাকা। যেন মিলেমিশে হরিলুট চলছে ফটিকছড়িতে!
পুলিশ ক্যাশিয়ার সাদ্দাম হোসেন চাঁদা তোলার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘ওসির নামে সড়কের লাইনটি আমাকে চালাতে হয়। প্রতিমাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই ওসিকে বুঝিয়ে দিতে হয় দুই লাখ টাকা। আগে আমি মাসিক বেতনে চাকরি করতাম। এখন আমি উভয় সংকটে। কাজটি ছাড়তেও পারছি না, রাখতেও পারছি না। প্রতিদিন নানা মানুষের নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। আমি নিজেই বুঝছি না এখন আমার কি করা উচিত।’
তার এই বক্তব্য গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করা হয়। তিনি অকপটে স্বীকার করছেন চাঁদাবাজির বিষয়টি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডাম্পট্রাকের চালক বলেন, “মাটি পরিবহনের কাজ শুরু করার আগেই গাড়িপ্রতি ৫০০ টাকা দিয়ে সাদ্দামের কাছ থেকে ওসির ‘লাইন’ নিতে হয়। এই লাইন না নিলে পুলিশ গাড়ি ধরে নিয়ে যায়। তখন অনেক টাকা জরিমানা দিয়ে গাড়িটি উদ্ধার করতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই আমরা টাকা দিই।”
কাঞ্চননগরের আবছার নামে এক গাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘পুলিশের ক্যাশিয়ার সাদ্দামকে সেগুন গাছ গাড়িপ্রতি এক হাজার ও গামারিসহ অন্যান্য গাছ গাড়িপ্রতি ৬০০ করে পুলিশের লাইন খরচ দিতে হয়।’
উপজেলার সর্তাখালের একটি বালুমহলের ম্যানেজার খোকন দে বলেন, ‘বৈধ বালুমহাল হলেও মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে প্রতিমাসে পুলিশের নাম দিয়ে ৫ হাজার টাকা করে নেয়।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর এক ইজারাদার জানান, ‘প্রতিমাসে ওসির টাকা দিতে দেরি হলে পুলিশ পাঠায়। র্দীঘদিন থেকে এই টাকা দিতে হয় ওসিকে।’
একাধিক ট্রাকচালক জানান, ‘নির্ধারিত এই চাঁদা না দিলে সড়কে চলাচলই কঠিন হয়ে পড়ে। নানা অজুহাতে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়।’
ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সেলিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘লাইন থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। সাদ্দামকে আমি চিনি না। খোঁজ খবর নিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, থানায় ক্যাশিয়ার প্রথা থাকার কথা না। প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে একজন ওসি অবৈধ টাকা গ্রহণ করা খুবই অনৈতিক। টাকার বিনিময়ে অবৈধ কাজকে বৈধ করা হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তাই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে খুবই দায়িত্বশীল হতে হয়। দুর্নীতি বন্ধ করার বদলে নিজে অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়ালে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।