সামিয়া আক্তার। বয়স মাত্র চার বছর। স্কুলে যাওয়ার বয়সও হয়নি তার। পৃথিবীর পাপ-পুণ্য, ভালো-মন্দও বোঝে না সে। তবুও নিষ্পাপ এই শিশুটির জীবন থেমে গেছে নিষ্ঠুরতায়।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে মা জাহানারা বেগমের সঙ্গে মাটিচাপা অবস্থায় সামিয়ার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা দুজনই ১০ দিন ধরে নিখোঁজ ছিল।
সামিয়া আক্তারের বাবা ও জাহানারা বেগমের স্বামীর নাম আমজাদ শেখ। তাদের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের কর্ণসোনা গ্রামে। তিনি ঢাকার একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন। স্ত্রী জাহানারাও ওই ইটভাটায় শ্রমিকদের জন্য রান্নার কাজ করতেন। সেখানেই মা-বাবার সঙ্গে থাকত ছোট্ট সামিয়া।
জানা গেছে, ইটভাটার কাজ শেষ করে ২০ দিন আগে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন আমজাদ ও তার পরিবার। গত ৪ মে পাশের গ্রামে আমজাদের ফুফাতো ভাই আলা খাঁয়েরের চল্লিশার অনুষ্ঠান ছিল। জাহানারা ও তার মেয়ে সামিয়া সেই বাড়িতে দাওয়াতে যান। কিন্তু রাতে তারা আর বাড়ি ফেরেননি। আমজাদ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে গোয়ালন্দ থানায় একটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তবে সঙ্গে এনআইডি কার্ড না থাকায় পুলিশ তা গ্রহণ করেনি।
ঘটনার ১০ দিন পর গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের কালিতলা যতিনবদ্দি এলাকার একটি পুকুরপাড়ে মাটিচাপা অবস্থায় লাশের একটি পা টেনে বের করে কয়েকটি কুকুর। স্থানীয়রা এটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশ এসে মাটি খুঁড়ে প্রথমে জাহানারার মরদেহ ও পরে তার নিচ থেকে শিশু সামিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে। সন্ধ্যায় সুরতহাল শেষে মরদেহ দুটির ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
স্বামী আমজাদ শেখ দাবি করেছেন, ইটভাটায় কাজ করার সময় তার স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে তার কয়েকবার বাগবিতণ্ডাও হয়।
তিনি বলেন, ‘গত ৪ তারিখে আমার স্ত্রী ও মেয়ে ফুফাতো ভাইয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেতে বের হয়েছিল। এরপর বাড়িতে না ফেরায় মোবাইলে ফোন দিলে বন্ধ পাই। তাদের না পেয়ে থানায় জিডি করি। আমার ধারণা ওই লোকটিই হত্যা করেছে। তার বাড়িও ওই এলাকায়।’
আমজাদের চাচাতো ভাই আজাদ শেখ বলেন, ‘যেদিন ভাবি নিখোঁজ হন, সেদিন বিকেল ৩টার দিকে আমার দোকান থেকে ৩০ টাকা মোবাইলে লোড দেন। সন্ধ্যায় ভাই এসে বলে তোর ভাবিকে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন সেই নম্বরে ফোন করলে ভাবি শুধু হ্যালো বলে ফোন কেটে দেন। এরপর ফোন বন্ধ। এই জঘন্য কাজ যারা করেছে তাদের বিচার চাই।’
আমজাদের মা রাজিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার নাতনি কত ছোট। ওর মুখটা চোখের সামনে ভাসছে। মা-মেয়েকে কত কষ্ট দিয়ে মেরেছে। যারা এভাবে মেরেছে তাদের বিচার চাই।’
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জাহানারা ও তার মেয়ে নিখোঁজের পর থানায় একটি অভিযোগ নিয়ে আসেন আমজাদ। তবে সঙ্গে এনআইডি না থাকায় তাকে সেটা আনতে বলি। এরপর সে আর থানায় আসেনি। আমাদের অফিসার দুই দিন তার বাড়িতে গেছেন, তার পরও সে থানায় আসেনি।’
এ ঘটনায় ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।