শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জাতীয় সম্পদ। এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যাংকের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা, কর্মসংস্থান, জীবিকা ও আর্থসামাজিক ভারসাম্য জড়িত। কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়নি; তা করাও হবে না। এটা এস আলমেরই হোক কিংবা বেক্সিমকোর বা অন্য কারও হোক। বরং প্রতিষ্ঠান সচল রাখতে সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতাও দিচ্ছে। সুতরাং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা দেওয়া হবে।
সোমবার (১৮ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এবং ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।
মূলত ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় থাকাকালে এস আলমের নেওয়া ঋণ উদ্ধারের প্রক্রিয়া সম্পর্কিত সর্বশেষ তথ্য গণমাধ্যমে শেয়ার করতে ওই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।
প্রশ্নোত্তর পর্বে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানকে আমরা বন্ধ করিনি। এটা এস আলমেরই হোক, বেক্সিমকোর বা অন্য কারও হোক। প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় সম্পদ। প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে, চালাতে হবে। সেখানে আমাদের শ্রমিকদের জীবিকা আছে। এর সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের স্বার্থ আছে। উৎপাদন কার্যক্রমের বিষয় রয়েছে। এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে বাণিজ্য সম্পর্ক আছে। এগুলো তো বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। আমরা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার চেষ্টা করেছি, যাতে ফান্ড ডাইভারসনটা (অর্থ স্থানান্তর) না হয়। এটা আমরা কন্টিনিউ করব। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করব না। প্রতিষ্ঠান ভাঙা সহজ। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান গড়া অনেক কঠিন। ইন্ডাস্ট্রি এবং এন্টারপ্রাইজ ভাঙতে আমরা দেব না। তাড়াহুড়া, ইমোশন এগুলো ভালো না। ইমোশন দিয়ে উত্তেজিত করা যায়। এ থেকে বড় ভুল হতে পারে। কিন্তু ইমোশন দিয়ে দেশ চললে সেটার ফলাফলও ভালো হবে না নিশ্চয়ই। বিধিবহির্ভূত যেসব ইস্যু আছে তা ধীরে ধীরে সময় নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে। আমরা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নই।’
এ সময় ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘ব্যক্তি এস আলম আর এস আলম লিমিটেড কিন্তু এক নয়। এত বড় প্রতিষ্ঠান কিন্ত শুধু এস আলম চালায় না। তার একটা সেটআপ রয়েছে। এস আলমকে ফোন করলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার সবগুলো কোম্পানির সিএফওদের (চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার) সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে, নিয়মিত কথা হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক তাদের সঙ্গে ব্যবসা করছে। বিশেষ করে শতভাগ মার্জিন নিয়ে আমদানি ঋণপত্র করছে। আমরা তাদের স্টক দেখেছি। সম্পদ দেখেছি। ব্যাংকের টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। বিল্ডিং করা হয়েছে, অন্যান্য স্থাপনা করা হয়েছে, কর্মসংস্থান আছে, জীবিকার বিষয় আছে। এর সঙ্গে জিডিপির অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয় আছে। একটা প্রতিষ্ঠান চাইলেই বন্ধ করা বা ধ্বংস করে দেওয়া যায় না। একটা প্রতিষ্ঠান হয়তো ধ্বংস করা খুব একটা কঠিন না, কিন্তু গড়ে তোলা কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন, কোনো শিপ (জাহাজ) বা প্লেন (উড়োজাহাজ) যখন যাত্রা সম্পন্ন করে, তখন নাবিক, বৈমানিক ও ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন হয়। কোনো শিপ বা প্লেন পরিত্যক্ত করা হয় না। এস আলমের কোনো শিল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়নি। এটা করাও হবে না। প্রতিষ্ঠান তার মতো করে চলবে, চলছে। যেমন আপনারা দেখেছেন, বেক্সিমকোর প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্র থেকে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। বেক্সিমকোর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চলমান আছে। তেমনি এস আলমের এসএস পাওয়ার চলছে। আমরা শতভাগ মার্জিন (আমদানি দায়ের অর্থ অগ্রিম পরিশোধ সাপেক্ষে) নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করতে দিচ্ছি। এস আলমের সঙ্গে আমাদের ব্যাংকের ব্যবসা হচ্ছে।’
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জানান, এস আলমের জব্দ করা শেয়ার বিক্রির জন্য আগামী সপ্তাহে মামলা করা হবে। আগামী জানুয়ারিতে ওই সব শেয়ার বিক্রি করে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে।
তিনি বলেন, ‘এস আলম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ঋণ-সম্পর্কিত বিষয়ের যথার্থতা নিরূপণে নীরিক্ষা প্রতিষ্ঠান (অডিট ফার্ম) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ করছে। ডিসেম্বরে আমরা অডিট রিপোর্ট পাব। তারপর এস আলমের ঋণ-সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারব। আনুমানিক ৪৫টি শাখা থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো ঋণ এস আলম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে গেছে বলে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা ছিল আমদানি দায়। ওই দায় আমরা পরিশোধ করেছি। এখন ২০ হাজার কোটি টাকার দায় পরিশোধের কারণে ব্যাংকে সাময়িক তারল্যসংকট আছে। আশা করছি এস আলমের জব্দ করা শেয়ার বিক্রি করে ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে। আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আমরা তুলব শেয়ারবাজারে নতুন শেয়ার ছেড়ে। এ ছাড়া এস আলমের সম্পদ ও বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণের ব্যবস্থা হচ্ছে। ব্যাংকের টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থাও হবে। তবে কতটা করা যাবে এই মুহূর্তে তা বলা কঠিন।’
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, গণমাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে শুধু নেতিবাচক কথাই প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু ইতোমধ্যে আমরা বেশ কিছু ইতিবাচক বিষয় অর্জন করেছি, যা আপনাদের সামনে তুলে আনা দরকার। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ, হারানো রেমিট্যান্স ফিরিয়ে আনা এবং এজেন্ট ব্যাংকিং শক্তিশালীকরণ।
তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ছেড়ে চলে যাওয়া সৌদি আরবের আল রাজি গ্রুপ ও অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের শেয়ার অফার করা হবে। এ ছাড়া দেশে বড় কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপ বা অন্যদের জন্যও এ প্রস্তাব উন্মুক্ত থাকবে। আমরা তারল্য বাড়াতে চাই। এই মুহূর্তে ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহৎ ব্যাংক। এর আমানত রয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ আমরা ২ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করতে চাই।’
এ প্রসঙ্গে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গেও যোগাযোগ করে একই প্রস্তাব দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ‘টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন কোনো বিনিয়োগকারী আমরা নেব না।’
এক প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর বলেন, ব্যাংকের সুরক্ষা দেওয়া হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।