কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে একসময়ের পরিচিত ও পুষ্টিকর খাদ্যশস্য কাউন আজ বিলুপ্তির পথে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষিজীবী মানুষের খাদ্যের অংশ হয়ে থাকা এ শস্য এখন আর চরাঞ্চলের মাঠে আগের মতো দেখা যায় না। জেলার প্রত্যন্ত চরের কৃষকরা কাউন চাষ ছেড়ে ঝুঁকছেন বেশি লাভজনক ও উচ্চ ফলনের ফসলের দিকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুড়িগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে জেলার মাত্র ৬০ হেক্টর জমিতে কাউনের চাষ হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালে চাষ হয়েছিল ৪২০ হেক্টর জমিতে। দুই দশক আগে কমপক্ষে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে কাউন চাষ হতো। একসময় যেসব চরভূমিতে সোনালি কাউনের ঢেউ উঠত, সেখানে এখন চাষ হচ্ছে ধান, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা বাণিজ্যিক ফসল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুড়িগ্রামের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বর্তমান ধারায় পরিবর্তন না এলে এক দশকের মধ্যেই চরাঞ্চল থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে কাউন। এটি শুধু ফসলচক্রের পরিবর্তন নয়, বরং একটি গ্রামীণ খাদ্য ঐতিহ্যের অবক্ষয়।’
কাউন বা ফক্সটেল মিলেট একটি শুষ্ক সহনশীল ও কম খরচের শস্য। বন্যা বা দুর্ভিক্ষের সময় চরবাসীর ভরসা ছিল এ ফসল। ধানের তুলনায় কম পানি ও সার লাগে বলে দরিদ্র কৃষকরা সহজে এটি চাষ করতেন। ভাতের বিকল্প হিসেবে এটি খাওয়া হতো।
তবে সময় বদলেছে। কৃষকরা এখন লাভের কথা ভাবেন। নাগেশ্বরীর চর বামনডাঙ্গার কৃষক নজরুল ইসলাম (৬৫) বলেন, ‘কাউনে লাভ নেই। গত বছর পাঁচ বিঘা জমিতে চাষ করেছিলাম, এবার করেছি এক বিঘায়। প্রতি বিঘা থেকে চার থেকে ছয় মণ পাওয়া যায়। মণপ্রতি বিক্রি হয় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। কিন্তু খরচ পড়ে আড়াই হাজার টাকা। হিসাব মেলে না।’
বাড়তি উৎপাদন খরচ, শ্রমিকসংকট ও ভোক্তার রুচির পরিবর্তনে কাউন আজ অতীত হতে চলেছে। অনেকেই মনে করেন, এ শস্য এখন আর যুগোপযোগী নয়।
সদরের চর ত্রাপুরের কৃষক বদিয়ার রহমান (৭৭) বলেন, ‘আগে বন্যার কারণে ধান হতো না। তখন কাউনই ছিল ভাত। এখন হাইব্রিড ধান করি, ভুট্টাও হয় ভালো। কেউ আর কাউন খায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘একসময় আমরা নিয়মিত কাউনের ভাত খেতাম। শরীরেও শক্তি পেতাম। এখন সেই স্বাদই ভুলে গেছি।’
তবে কাউন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বর্তমানে এটি পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চিলমারির জোড়গাছ বাজারের ব্যবসায়ী মমতাজ আলী বলেন, ‘কৃষকের কাছ থেকে কাউন কিনে আমি ঢাকার পাখির বাজারে পাঠাই। এখন পাখিপ্রেমীরাই কাউনের বড় ক্রেতা।’ তিনি জানান, এক সময়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় শস্য আজ পরিণত হয়েছে প্রান্তিক পণ্যে, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির দিক থেকেও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের এ সময়ে কাউনের মতো খরাসহনশীল ও কম খরচের ফসল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ও বাজার উৎসাহ না থাকলে চাষিরা এ ফসল টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী হবেন না।’ সূত্র: ইউএনবি