প্যারিসে ২০১৬ সালের অক্টোবরে ভয়াবহ ডাকাতির শিকার হন যুক্তরাষ্ট্রের টিভি রিয়েলিটি শো তারকা কিম কারদাশিয়ান। মঙ্গলবার (১৩ মে) প্যারিসের আদালতে সেই মামলার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি।
আদালতে কারদাশিয়ান জানান, ঘটনার সময় তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট জানায়, ঘটনার সময় ফ্যাশন উইকের জন্য কিম প্যারিসের বিলাসবহুল ‘নো অ্যাড্রেস’ হোটেলে অবস্থান করছিলেন। এদিন গভীর রাতে টিভি তারকা যখন বিছানায় শুয়ে ছিলেন তখন পাঁচ মুখোশধারী অস্ত্রধারী তার কক্ষে ঢুকে তাকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে।
একই দিন পৃথক এক প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, এসময় পুলিশের পোশাক পরা একজন ডাকাত তার আঙ্গুলের দিকে ইঙ্গিত করে ‘আংটি, আংটি’ বলে চিৎকার করে, তারপর তাকে বিছানার উপর টেনে নিয়ে যায়, তাকে নগ্ন করে জিপ টাই এবং টেপ দিয়ে তার কব্জি এবং গোড়ালি আটকে রাখে। তারপর তারা মুখে টেপ লাগিয়ে বাথরুমে নিয়ে তাকে মেঝেতে ফেলে রাখে।
এসময় ডাকাতেরা তার প্রায় ৯০ লাখ ডলার (১০৯ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের অলংকার লুট করে নিয়ে যায়। এসবের মধ্যে ছিল তার সাবেক স্বামী কানিয়ে ওয়েস্ট উপহার দেওয়া ৪০ লাখ ডলারের (৪৮ কোটি টাকার বেশি) একটি হিরার আংটি, দুটি ডায়মন্ড কার্টিয়ার ব্রেসলেট, একটি সোনার রোলেক্স, ডায়মন্ড কানের দুলসহ আরও মূল্যবান গয়না।
আদালতে কিম বলেন, ‘পুলিশ অফিসারের পোশাক পরা দুজন ব্যক্তি ভবনের দারোয়ানকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে রেখে ঘরে প্রবেশ করে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে। আমি ঘুমাতে যাচ্ছিলাম। আমি তখন এক প্রকার উলঙ্গ ছিলাম। তাই তাড়াহুড়ো করে শুধু একটি হালকা গাউন পরে নিয়েছিলাম যা ডাকাতেরা আমাকে টানার সময় খুলে যায়। আমার মনে হচ্ছিল, তারা এখনই আমাকে ধর্ষণ করবে।’
তবে শেষ পর্যন্ত ডাকাতেরা কিমের পা বেঁধে দেয়। কিম বলেন, ‘আমি বারবার বলছিলাম, ‘আমার বাচ্চারা আছে, আমাকে ওদের কাছে ফিরতেই হবে।’ কিন্তু তারা চুপ করিয়ে দেয়। আমি নিশ্চিত ছিলাম, তারা আমাকে গুলি করবে।’
কিম জানান, ডাকাতেরা যখন স্পষ্টভাবে অলংকার লুটেই সন্তুষ্ট ছিল, তখনো তার মনে হচ্ছিল যে প্রাণে বাঁচা সম্ভব নয়। তিনি প্রার্থনা করেন নিজের মা, বোন কোর্টনি এবং বন্ধুদের জন্য। তিনি ভাবেন, কোর্টনি যখন হোটেলে ফিরবেন, তখন তাকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে আজীবন সেই দৃশ্য মনে রাখবেন।
ডাকাতেরা চলে যাওয়ার পর কিম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। তিনি নিশ্চিত হতে চাইছিলেন, তারা চলে গেছে কি না। পরে জিপটাই কেটে নিজেই মুক্ত হন এবং লাফিয়ে নিচের তলায় তার স্টাইলিস্টের রুমে গিয়ে সাহায্য চান।
ঘটনার পর থেকে কিম তার নিরাপত্তা বাড়িয়েছেন। তিনি জানান, আগে তিনি বিদেশ সফরে বা বাড়িতে কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন মনে করতেন না। এখন তার সঙ্গে সব সময় চার থেকে ছয়জন নিরাপত্তাকর্মী থাকেন।
এই মামলায় ১০ জন অভিযুক্তের বিচার চলছে। এদের অনেকেই প্রবীণ, যাদের ‘গ্র্যান্ডপা গ্যাং’ নামে অভিহিত করেছে ফরাসি গণমাধ্যম।
অভিযুক্তদের মধ্যে ৭১ বছরের ইউনিস আব্বাস নিজেকে অপরাধে জড়িত বলে স্বীকার করেন এবং ২০২১ সালে ‘আই কিডন্যাপড কিম কারদাশিয়ান’ নামে একটি বইও লিখেন। তবে আদালতে তিনি জানান, বইয়ের শিরোনাম তার নিজের দেওয়া নয় এবং এটিতে তার ভূমিকা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ফরাসি পুলিশ জানায়, ডাকাতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে প্রথমে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বর্তমানে বিচারাধীনদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন সরাসরি ডাকাতিতে অংশ নেয়নি। তবে তাদের সহকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, ডাকাতেরা সামাজিক মাধ্যমে কিমের পোস্ট দেখে কিমের অবস্থান শনাক্ত করেছিল।
এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কিম কারদাশিয়ানের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আদালতে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো সেই ট্রমা ভুলতে পারিনি। জীবন চিরতরে বদলে গেছে।’
এছাড়া বিচারক ডেভিড ডি পাস বলেন, কিমের শোবার ঘরে থাকা দুই বন্দুকধারীর মধ্যে একজন, ৬৮ বছর বয়সী আওমার আইত খেদাচে, যিনি ‘ওল্ড ওমর’ নামে পরিচিত। তিনি কার্দাশিয়ানকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে তিনি আক্রমণের ট্রমা সম্পর্কে কিম কথা বলার পর তিনি যে কষ্ট পান এবং তার জন্য অনুশোচনা করেন। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট এবং দ্য গার্ডিয়ান
সুলতানা দিনা/