নবম পর্ব
ফটিকের শেষ যে ঘনিয়ে এসেছে, সেটা নিজেই সে জানিয়ে দিয়েছে, প্রলাপ বকে। ‘‘ফটিক খালাসিদের মতো সুর করে বলিতে লাগিল, ‘এক বাঁও মেলে না। দো বাঁও মেলে না।” রবীন্দ্রনাথ আরও জানাচ্ছেন, ‘যে অকুল সমুদ্রে সে যাত্রা করিতেছে, বালক রশি ফেলিয়া কোথাও তার তলা পাইতেছে না।’
শেষ মুহূর্তে গ্রাম থেকে তার মা এসেছেন। কিন্তু ফটিকের সঙ্গে তার কথা হলো না। “ফটিক আস্তে আস্তে পাশ ফিরিয়া কাহাকেও লক্ষ্য না করিয়া মৃদু স্বরে কহিল, ‘মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, আমি বাড়ি যাচ্ছি’।” ওইখানেই সমাপ্তি; জীবনের এবং গল্পের।
শরৎচন্দ্র তার গল্পের একেবারে ভেতরে চলে যান; রবীন্দ্রনাথ যান না, যাননি এ গল্পেও। পাশে দাঁড়িয়ে থেকে নির্মম এক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন; ট্র্যাজেডির লেখকরা যেমনটা দিয়ে থাকেন।
এই দুই বালক- রাম ও ফটিক, আমার খুব আপনজন ছিল। আর ছিল অপু, এবং অপুর বোন দুর্গা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কিছুটা পরে পড়েছি। অনেক নয়, অল্পকিছু দিন পরে। ‘আম আঁটির ভেপু’ নামে একটি কিশোর-সংস্করণ বের হয়েছিল, সেটিও পড়েছি।
বালক অপুর ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন। অপু মোটেই ডানপিটে নয়। সর্দার নয়, সর্দার বরঞ্চ তার বোন দুর্গা। অপু বিষণ্ন এক বালক। শত্রু তারও আছে। মস্ত বড় এক শত্রু। কিন্তু সে শত্রু কোনো দিগম্বরী নয়, তার নিজের বয়সটাও নয়, কলকাতা শহরের হৃদয়হীনতাও নয়; তার শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য। অপু-দুর্গারা বড়ই দরিদ্র। তারা ব্রাহ্মণ, কিন্তু এতই দরিদ্র যে সম্ভ্রম রক্ষা করা কঠিন।
তাদের জীবনে অতিনাটকীয় কিছু ঘটে না। ভাইবোনে মিলে ঘুরে বেড়ায়। নিশ্চিন্দিপুর নামের সেই গ্রাম, গ্রামের পাশে বন, কিছু দূরে রেললাইন, সবকিছু বড় জীবন্ত, ওই ভাইবোনের কারণে। এটা জেনে আমার ভারি অবাক লেগেছে যে, ‘পথের পাঁচালী’র আদি পরিকল্পনায় দুর্গা মেয়েটি ছিল না। সেটা কেমন কথা? দুর্গা ছাড়া ওই কাহিনি চলবে কী করে? চলবে না জেনেই বিভূতিভূষণ দুর্গাকে নিয়ে এসেছেন; এনে উপন্যাসকে পূর্ণতা দিয়েছেন।
নিশ্চিন্দিপুর এবং দুর্গা অভিন্ন। অপু তার বোনের পেছনে পেছনে চলে। অপুই বরঞ্চ মেয়েলী, দুর্গার তুলনায়। দুর্গার চেহারা উসকোখুসকো, তার চুল রুক্ষ। আঁচলে থাকে ফুল ও ফল। পরের বাড়ির বাগানে আম কুড়াতে গিয়ে অপমানিত হয়, ঝাড়লাইটের রঙিন কাচ পেয়ে সে মনে করে হীরা পেয়েছে। হারানো বাছুর খুঁজতে গিয়ে রেলরাস্তায় গিয়ে পৌঁছেছিল। তাকিয়ে দূর দিগন্ত দেখে তারা, ভাই-বোনে। টেলিগ্রামের তার ও থাম দেখে। ভাবে তারা হারিয়ে গেছে। বালক অপু তবুও বের হয়ে যেতে পেরেছে ওই গ্রাম ছেড়ে; বালিকা দুর্গা পারেনি। দুর্গা মারা গেছে, তাদের ওই গ্রামেই। এর চৌহদ্দির বাইরে সে যাবে না, যেতে পারবে না। গুলতি ছুড়ে অপু পাখি মেরেছিল; দুর্গা তাকে বকেছে; বলেছে, ‘কখ্খোনো ওরকম করিস না আর। বনে জঙ্গলে উড়ে বেড়ায়, কারোর কিছু করে না, মারতে আছে, ছিঃ।’ সেই দুর্গাই কিন্তু চুরি করেছিল। প্রতিবেশী ধনী ঘরের সোনার সিঁদুর কৌটা চুরি করে সে লুকিয়ে রেখেছিল। প্রহারে প্রহারে জর্জরিত হয়েছে, কিন্তু স্বীকার করেনি। দিদির মৃত্যুর পরে অপু আবিষ্কার করেছে লুকানো সেই কৌটা। দুঃখ পেয়েছে, অবশ্যই। আমরা দুঃখ পাই কি? না, আমি পাই না। আমার তো বরং মনে হয়েছে, ওই রকমের একটা কৌটা দুর্গার থাকা দরকার ছিল; না থাকাটাই অন্যায়।
রামলাল কাঁদিয়েছে, ফটিক স্তব্ধ করে দিয়েছে, অপু যে অনুভবের সৃষ্টি করেছে সেটি না-কান্নার, না-স্তব্ধতার; সেটি বিষণ্নতার। যেরকম বিষণ্নতা আমি আমার কৈশোরে আমাদের গ্রামে দেখেছি, দেখেছি রাজশাহী শহরে, দেখেছি আমার অসীম সাহসী দাদির চেহারায়। ‘পথের পাঁচালী’তে বিষণ্নতাই প্রধান; যেমন প্রকৃতির তেমনি মানুষের।
ওই তিনটি কাহিনি আমাকে বিশেষভাবে শিক্ষিত করেছে বলে আমার ধারণা। সে শিক্ষা কোনো পাঠ্যবইয়ে প্রাপ্তির তুলনায় অধিক। শিক্ষাটা হচ্ছে অনুভবের এবং নিজের বাইরে গিয়ে অন্যের জীবনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার। রামলালকে আমার ঈর্ষণীয় মনে হয়েছে, বিশেষ করে তার দল গড়বার ক্ষমতার জন্য; অপু-দুর্গাকে আমি আমার নিজের মধ্যেই দেখতে পেয়েছি, মনে হয়েছে বুঝি-বা আমিও ঘুরে বেড়াচ্ছি ওদের সঙ্গে, গ্রামের পথে পথে। আর ফটিক তো আমার ভয়েরই একটি অংশ হয়ে গিয়েছিল। ভয়টা ছিল হারিয়ে যাওয়ার। ছেলেবেলায় আমি যে খুব স্বপ্ন দেখতাম তা নয়। দেখলেও ভুলে গেছি। একটি দুঃস্বপ্নের কথা কিন্তু বেশ মনে আছে। সেটা এই রকমের যে, একাকী আমি দাঁড়িয়ে আছি একটি মাঠের কোণে। মাঠটা ক্রমাগত বড় হচ্ছে, আর আমি যাচ্ছি ছোট হয়ে। এটা দেখে স্বপ্নের ভেতরেই আমি চিৎকার করে উঠতাম। তাতে ঘুম ভেঙে যেত; এবং আমি আশ্বস্ত হতাম এটা দেখে যে আমি শুয়ে আছি, বিছানায়।
গ্রামের স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে আমি এলাম রাজশাহীতে। প্রত্যাশিত ছিল যে দ্বিতীয় শ্রেণিতেই ভর্তি হব, এবং নবযাত্রা শুরু করব। কিন্তু আব্বা আমাকে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন- লোকনাথ হাই স্কুলে। একেবারে ডবল প্রমোশন। এখন বুঝি আমার পিতা তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে নিয়েছিলেন যে বিশ্বটা প্রতিযোগিতামূলক এবং এখানে এগিয়ে যেতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে হবে। তাই ওই বেড়া-ডিঙানো। কিন্তু আমি তো তৃতীয় শ্রেণির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাই গিয়ে পড়েছিল আব্বার ঘাড়েই। নিজেই তিনি সেটা নিয়ে নিয়েছিলেন। সে জন্য তাকে কিছুদিন আমার গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। আমার মেজো ভাইকে একই স্কুলে ভর্তি করা হলো ক্লাস ওয়ানে।
বাসার কাছেই ছিল মিশন গার্লস স্কুল। সেখানে প্রাথমিক স্তরে ছেলেদেরও নেওয়া হতো। ওই স্কুলে আমার আরেক ছোট ভাইয়ের স্থান হলো। মিশন গার্লস স্কুলের ব্যবস্থাপক ছিলেন খ্রিষ্টান মিশনারিরা, তারা ছিলেন আমেরিকান। ওই স্কুলের এক বার্ষিক অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে। আমার ওই ভাইটির কারণে, (ফখরুল ইসলাম চৌধুরী নাম, পরে সে চিকিৎসক হয়েছিল, ২০২৩-এ তাকে আমরা হারিয়েছি) অভিভাবকরা নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। সেই সুবাদে আব্বা-আম্মার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম অনুষ্ঠানে। সেটা ছিল ছোটখাটো একটা উৎসব; মিশনারিদের উদ্ভাবনা ও যত্ন ছিল পেছনে। প্রাথমিকের শিশুরা খরগোস সেজে অভিনয় ও গান করেছিল; একটি গান ছিল, ‘আমরা খরগোস দলে দলে, বাস করি ওই গাছের তলে; গাছের আড়াল থেকে আমরা উঁকি মারি’। খরগোসদের মধ্যে আমার ভাইটিও ছিল। কিন্তু যে অনুষ্ঠানটির কথা বিশেষভাবে মনে আছে সেটি ছিল নির্বাক। ছাত্রীদের একজন সেজেছিল ভারতমাতা; তার উজ্জ্বল সাজসজ্জার ভেতর বিশেষভাবে যেটা লক্ষণীয় ছিল সেটা হলো সমস্ত শরীর ঘিরে শিকলের বন্ধন। তার পায়ের কাছে ছিল একটি সাদা কাগজ, বড় বড় অক্ষরে যাতে লেখা ‘ভারতমাতা’। স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন তখন জোরদার হয়ে উঠেছে, বন্দিনীর ওই মূর্তিটিতে ছিল তারই প্রতিফলন। মিশনারিরা নিবৃত্ত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন কি না জানি না, হয়ে থাকলেও সফল যে হননি তার সাক্ষ্য তো ছিল জাজ্বল্যমান। পরে জেনেছি, যে মেয়েটি ‘ভারতমাতা’ সেজেছিল সে ছিল সরকারি কলেজের একজন মুসলমান অধ্যাপকের কন্যা।
রাজনীতি প্রবল হয়ে উঠছিল। শহরের প্রধান এলাকা সাহেববাজার; সেখানে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টি- তিন দলেরই অফিস দেখেছি। কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের কথা বিশেষভাবে মনে আছে। দুই কারণে। প্রথম কারণ তাদের লাল পতাকা। দ্বিতীয় কারণ শহরের দর্জিদের এক ধর্মঘট, যাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টির সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারটা যে টের পেয়েছিলাম তার হেতু আছে। সেটা এই যে, আমাদের পাড়াতেই পার্টির একজন কর্মী ছিলেন যিনি ওই ধর্মঘট সম্পর্কে একটি লিফলেট অন্যদের এবং আমাকেও হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, যেটিতে ধর্মঘটীদের দাবিদাওয়ার কথা, ধর্মঘট উপলক্ষে টাউন হলে যে এক সমাবেশ হবে তার খবর এবং তাতে যোগদানের আহ্বান ছিল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে এমনও উল্লেখের কথা মনে পড়ে।। লিফলেটে মুদ্রিত পার্টির নাম বেশ ভালোভাবেই চোখে পড়েছে। ততদিনে আমি ক্লাস সিক্সে উঠেছি, চলাফেরায় কিছু স্বাধীনতা এসেছে; কৌতূহলবশত টাউন হলে যে গিয়েছিলাম সেটাও মনে আছে।
শহরে যাকে সাম্প্রদায়িকতা বলে তেমন কিছু চোখে পড়েনি। আমাদের বাসার পাশেই একটা খাল ছিল। বলাই বাহুল্য- সে খাল গ্রামের খালের মতো নয়। ওটি ছিল বর্ষাকালে পদ্মা নদী প্রমত্ত হলে জোয়ার যাতে শহরকে বিপদে ফেলতে না পারে তার জন্য স্লুইস গেট খুলে দিলে পানি যেন শহরের ভেতরে শান্তভাবে ঢুকতে পারে তার জন্য তৈরি প্রশস্ত একটি নালা। তবে নালায় অন্য সময়েও অল্পস্বল্প পানি থাকত। আমাদের বাসা-সংলগ্ন নালার অপর পাড়ে ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ধনী পরিবারের বসবাস। তাদের ছিল একটি সাবানের কারখানা, বাড়ির পাশেই। ওই পরিবারটির উদ্যোগে পূজা হতো, বিশেষ করে মনে আছে দুর্গাপূজার ঘটনা। সে পূজা ছিল যথার্থই সর্বজনীন; আমরাও গেছি দেবীর মূর্তি দেখতে।
চলবে...