হৃৎপিণ্ড আমাদের জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হৃৎপিণ্ড নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্ত পাম্প করে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হৃৎপিণ্ডে রয়েছে চারটি বিশেষ ‘ভাল্ভ’ বা কপাটিকা।
এটা রক্ত চলাচলকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এগুলো একমুখী দরজার মতো কাজ করে–রক্তকে সামনে যেতে দেয়, কিন্তু পেছনে ফিরতে বাধা দেয়।
হৃৎপিণ্ডে কয়টি ভাল্ভ রয়েছে?
মানুষের হৃৎপিণ্ডে মোট চারটি ভাল্ভ বা কপাটিকা আছে। প্রতিটির অবস্থান ও কাজ ভিন্ন।
১. ট্রাইকাসপিড ভাল্ভ (ত্রিপত্র কপাটিকা): এটি ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝখানে থাকে। এই ভাল্ভটি শরীর থেকে আসা অক্সিজেনশূন্য রক্ত ডান অলিন্দ থেকে ডান নিলয়ে যেতে সাহায্য করে এবং রক্তকে পেছনে ফিরে যেতে বাধা দেয়।
২. পালমোনারি ভাল্ভ (ফুসফুসীয় কপাটিকা): ডান নিলয় ও ফুসফুসে যাওয়ার ধমনির মাঝখানে থাকে। এই ভাল্ভটি রক্তকে ফুসফুসে পাঠাতে সাহায্য করে, যেখানে রক্ত অক্সিজেন গ্রহণ করে।
৩. মাইট্রাল বা বাইকাসপিড ভাল্ভ (দ্বিপত্র কপাটিকা): বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের মাঝখানে অবস্থিত। এই ভাল্ভটি ফুসফুস থেকে আসা অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত বাম অলিন্দ থেকে বাম নিলয়ে পৌঁছে দেয়।
৪. অ্যাওর্টিক ভাল্ভ (মহাধমনি কপাটিকা): বাম নিলয় ও মহাধমনির মাঝখানে থাকে। এই ভাল্ভটি হৃৎপিণ্ড থেকে বিশুদ্ধ রক্ত সারা শরীরে পাঠায়।
ভাল্ভের প্রধান কাজ কী?
হৃৎপিণ্ডের ভাল্ভগুলোর মূল দায়িত্ব–
◉ রক্তের সঠিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং উল্টো প্রবাহ বন্ধ করা
◉ হৃৎপিণ্ডের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা
◉ শরীরের প্রতিটি অঙ্গে কার্যকর রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। সহজভাবে, ভাল্ভ নষ্ট হলে হৃৎপিণ্ডের পাম্প ব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
নারী ও পুরুষের ভাল্ভে কি পার্থক্য আছে?
◉ গঠনগতভাবে নারী ও পুরুষের হৃৎপিণ্ডের ভাল্ভ প্রায় একই ধরনের। তবে কিছু শারীরিক পার্থক্য দেখা যেতে পারে—
◉ পুরুষের হৃৎপিণ্ড সাধারণত কিছুটা বড় হতে পারে।
◉ নারীদের মধ্যে কিছু ভাল্ভজনিত সমস্যা, যেমন মাইট্রাল ভাল্ভ প্রোলাপ্স তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
◉ গর্ভাবস্থায় নারীর হৃদযন্ত্রে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, তাই আগে থেকে ভাল্ভ সমস্যা থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
◉ অর্থাৎ, ভাল্ভের সংখ্যা বা মৌলিক কাজ একই হলেও রোগের ঝুঁকিতে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।

ভাল্ভের সমস্যা হলে কী রোগ হতে পারে?
◉ ভাল্ভ সংকোচন: ভাল্ভ সরু হয়ে গেলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।
◉ ভাল্ভ অকার্যকারিতা বা লিক: ভাল্ভ পুরোপুরি বন্ধ না হলে রক্ত পেছনে ফিরে যায়।
◉ ভাল্ভ ঝুলে যাওয়া: ভাল্ভ সঠিকভাবে বন্ধ না হয়ে ফুলে ওঠে।
◉ ভাল্ভে সংক্রমণ: জীবাণু সংক্রমণে ভাল্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাধারণ উপসর্গ
◉ শ্বাসকষ্ট
◉ বুক ধড়ফড় করা
◉ দ্রুত ক্লান্তি
◉ বুকে চাপ বা ব্যথা
◉ মাথা ঘোরা
◉ পা ফুলে যাওয়া
◉ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
এক বা একাধিক ভাল্ভ নষ্ট হলে কি মানুষ বাঁচতে পারে?
হ্যাঁ, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কারণে এখন ভাল্ভ নষ্ট মানেই মৃত্যু নয়। চারটি ভাল্ভের প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ, তবে একটি ভাল্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকেই দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
চিকিৎসার উপায়
◉ ওষুধ
◉ বেলুনের মাধ্যমে ভাল্ভ প্রসারণ
◉ ভাল্ভ মেরামত
◉ কৃত্রিম বা জৈবিক ভাল্ভ প্রতিস্থাপন
বর্তমানে অনেক রোগী সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বহু বছর সুস্থভাবে জীবন কাটাচ্ছেন।
চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে?
◉ হৃদযন্ত্র বিকল হতে পারে
◉ মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলজনিত জটিলতা হতে পারে
◉ ফুসফুসে চাপ বাড়তে পারে
◉ হঠাৎ মৃত্যুও হতে পারে
ভাল্ভ সুস্থ রাখতে করণীয়
◉ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
◉ রিউম্যাটিক জ্বরের দ্রুত চিকিৎসা
◉ ধূমপান বর্জন
◉ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ
◉ নিয়মিত ব্যায়াম
◉ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
◉ সংক্রমণ প্রতিরোধ
◉ প্রয়োজনে ইকো পরীক্ষা
পরিশেষে বলতে চাই, হৃৎপিণ্ডের ভাল্ভ হলো জীবনের নীরব প্রহরী। এই চারটি কপাটিকা প্রতিনিয়ত আমাদের রক্ত সঞ্চালনকে সুশৃঙ্খল রাখে। ভাল্ভে সমস্যা দেখা দিলে তা অবহেলা করা বিপজ্জনক, তবে সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুস্থ জীবন সম্ভব।
তাই শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিকে ছোট সমস্যা মনে না করে দ্রুত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সেরা সিদ্ধান্ত।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক


