উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন তার দেশের ক্রমবর্ধমান অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তিকে আধুনিকীকরণ এবং ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর ব্যবহারকে ‘‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’’ বলে ঘোষণা করেছেন।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা (কেসিএনএ) গতকাল শুক্রবার জানিয়েছে, কিম গত বৃহস্পতিবার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের মানববিহীন অ্যারোনটিক্যাল টেকনোলজি কমপ্লেক্স পরিদর্শনের সময় বহুমুখী ড্রোন এবং মানববিহীন নজরদারি যানের কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করেন।
উত্তর কোরিয়ার এই নেতা তার সামরিক বাহিনীর মানববিহীন অস্ত্র ব্যবস্থার উন্নতির জন্য নতুন চালু হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিকে উন্নত করাকে ‘‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’’ হিসেবে জোর দিয়েছেন। কিম ড্রোনের ধারাবাহিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো এবং শক্তিশালী করার জন্যও আহ্বান জানান।
অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স পরিদর্শনের এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন মাত্র এক সপ্তাহ আগে কিম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ডিজাইন করা একটি নতুন সলিড ফুয়েল রকেট ইঞ্জিনের আরেকটি পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যাকে তিনি পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) অনুসারে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তির মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্রের ক্রমবর্ধমান মজুদ এবং একটি নতুন গোয়েন্দা স্যাটেলাইট প্রোগ্রাম রয়েছে।
বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার সক্রিয় সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখ, এবং এর সঙ্গে ৭ মিলিয়নেরও বেশি রিজার্ভ সদস্য রয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ২.৫৬ কোটির একটি বড় অংশ।
তবে, দেশটির এআই উন্নয়নের মাত্রা এখনো নিশ্চিত নয়।
‘৩৮ নর্থ’ নামক একটি স্বাধীন বিশ্লেষণ গোষ্ঠীর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তর কোরিয়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাবিদদের সাথে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতামূলক এআই গবেষণা চালিয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না থাকতে ‘যথেষ্ট প্রচেষ্টা’ নিয়েছে।
এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এই প্রচেষ্টাগুলো মূলত বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এআই খেলোয়াড় চীনের ওপর নির্ভরশীল।
যদিও পিয়ংইয়ং দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল, কিমের অধীনে দেশটি রাশিয়ার সঙ্গেও তার সম্পর্ককে দৃঢ় করতে চাইছে।
গত বছর, কিম এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা পশ্চিমা বিশ্বে ভ্রু কুঁচকে দিয়েছিল।
তবে, এই চুক্তি থেকে পিয়ংইয়ং মস্কোর মতো ততটা লাভবান নাও হতে পারে।
একটি জার্মান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সম্প্রতি জানিয়েছে যে, উত্তর কোরিয়া মস্কোকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে তারা মাত্র ৪৫৭ মিলিয়ন থেকে ১.১৯ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। মস্কোর এই সহায়তা মূলত খাদ্য, জ্বালানি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সম্ভবত কিছু যুদ্ধবিমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
চলতি মাসের শুরুতে কিম চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বেইজিংয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন, যাকে বিশ্লেষকরা বিশ্ব মঞ্চে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষার একটি স্পষ্ট প্রদর্শন হিসেবে দেখেছেন।
মে মাসে ডিআইএ জানায় যে, উত্তর কোরিয়া কয়েক দশকের মধ্যে তার সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এটি উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের ঝুঁকির মুখে ফেলার সামরিক সক্ষমতা রাখে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতাও উন্নত করে চলেছে।
কিম তার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে তার দেশের বিরুদ্ধে ‘‘আক্রমণাত্মক যুদ্ধের মহড়া’’ বলে নিন্দা করেছেন। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/