বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর এবার নজিরবিহীন ভাঙনের মুখে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। মহারাষ্ট্রের ‘শিবসেনা মডেল’ বা শিন্ডে মডেলের ছায়া এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বাংলায়। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের ভেতরের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও কোন্দল এবার প্রকাশ্য বিদ্রোহে রূপ নিয়েছে। দলের ভেতরের একটি বড় অংশ বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। দলটির বিধায়কদের একটি বড় অংশ এখন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত অমান্য করে এক বহিষ্কৃত নেতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দলটিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং বিধায়কদের ধরে রাখতে কলকাতায় দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে। তবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, তৃণমূল এখন কার্যত দুই টুকরো হওয়ার অপেক্ষায়।
তৃণমূলে এই তীব্র বিভাজন স্পষ্ট হয়ে যায় গত রবিবার। ওই দিন কলকাতায় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকা হয়েছিল। কিন্তু দলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই সেই বৈঠক বয়কট করেন। এরপর সোমবার চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরই জানা যায়, তৃণমূলের এক বিরাট অংশের বিধায়ক এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। তারা বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ঘটনার পরই দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অপর এক বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে তড়িঘড়ি দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল নেতৃত্ব।
দলের এই নজিরবিহীন সংকট নিয়ে তৃণমূলের সাবেক মুখপাত্র ও বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত নেতা ঋজু দত্ত এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা মডেল কার্যকর হচ্ছে। ঋজু দত্তর দাবি অনুযায়ী, তৃণমূলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ক এখন একাট্টা হয়েছেন। তারা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে বিধানসভার স্পিকারের কাছে আবেদন জানাতে যাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, যেহেতু তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই একজোট হয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তাই তাদের মনোনীত প্রার্থীই আইনত বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হবেন।
এদিকে দলের ভেতরের বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, এই ক্ষোভ বা বিদ্রোহ কিন্তু তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নয়। বিক্ষুব্ধ বিধায়ক ও নেতাদের সমস্ত রাগ ও অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দু হলেন দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনে হারের পর থেকেই দলের একাংশ অভিষেকের কার্যপদ্ধতি ও সিদ্ধান্তের ওপর চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন, যা এখন বিদ্রোহের আকার নিয়েছে।
এই সংকটের মধ্যে নতুন করে ঘি ঢেলেছে স্বাক্ষর জালিয়াতির এক মারাত্মক অভিযোগ। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম চূড়ান্ত করে স্পিকারের কাছে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তাতে বেশ কয়েকজন তৃণমূল বিধায়কের স্বাক্ষর জালিয়াতি করা হয়েছে। তিনি সরাসরি নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘তৃণমূলের দুর্নীতি শুধু বাংলার মানুষের সঙ্গেই নয়, নিজেদের বিধায়কদের সঙ্গেও হয়েছে। তৃণমূল নিজেদের বিধায়কদের স্বাক্ষর চুরি করেছে। এই অভিযোগ আমাদের নয়, স্বয়ং তৃণমূলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা এই জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন। এতে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই।’
এই অভিযোগের পরপরই ঋতব্রত ও সন্দীপনকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত হওয়ার পর বিধায়ক সন্দীপন সাহা সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই স্বাক্ষর জালিয়াতির পেছনে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দায়ী, কারণ তিনিই বিধায়কদের ওই তালিকায় স্বাক্ষর করেছিলেন। বর্তমানে এই স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলার তদন্ত করছে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি। ইতোমধ্যেই সিআইডি বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতাকে নোটিশ পাঠিয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তলব করেছে।
তৃণমূলের এই চরম দুর্দিনে তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিজেপি। রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের এই কোন্দল নিয়ে গত সোমবার বিজেপির প্রবীণ নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এক ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের যে অবস্থা, তাতে খুব শিগগির এই দলে শুধু পিসি আর ভাইপো (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। বাকি সব নেতাই দল ছেড়ে চলে যাবেন।’ সূত্র: এনডিটিভি