সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ডাকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে শত শত শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।
গতকাল শনিবার সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা কাগজের তৈরি তেলাপোকার মুখোশ ও লিফলেট হাতে নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানান। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রযুক্তিগত ত্রুটিসহ নানা অনিয়মের কারণে তিনি সমালোচনার মুখে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্নাতক ও ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন।
মেডিকেল কলেজে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী উৎকর্ষ রাজ এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সরকারের জবাবদিহি চাই। এই দেশে কীভাবে বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়? এটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?’
রাজ আরও বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।’ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামসহ মোতায়েন পুলিশ সদস্যদের কড়া নজরদারির মধ্যেই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
শনিবারই যুক্তরাষ্ট্র থেকে দিল্লিতে আসেন অভিজিৎ দিপকে। সমাবেশে তিনি বলেন, ‘দেশের তরুণরা আর কাউকে ভয় পাবে না, তারা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করবে।’
বিরোধী দল আম আদমি পার্টির সাবেক রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ দিপকে বলেন, ‘তেলাপোকা ভয় পায় না, আর সহজে মরে না।’ এ সময় উপস্থিত সমর্থকরা একযোগে তার স্লোগানে সাড়া দেন। বিক্ষোভকারীদের মতে, তরুণদের ক্ষোভের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
২০ বছর বয়সী সার্থক বলেন, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো পরিচালনায় সরকারের আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভারত এর চেয়ে ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।’ গত মাসে তদন্তকারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার পর দেশব্যাপী মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ।
ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি এনট্রান্স টেস্টসংক্রান্ত এই কেলেঙ্কারির পর কয়েকজন কিশোর আত্মহত্যা করেছে। এর আগে প্রায় ২০ লাখ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও আরেকটি বিতর্ক দেখা দেয়।
দুই ছেলেকে নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৫২ বছর বয়সী স্বপন জ্ঞান বলেন, ‘তরুণদের এসব পরীক্ষা দিতেই হবে। কিন্তু তারা এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না, যেখানে পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই হারিয়ে যায়।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতে সংগঠনটির এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ দিল্লির একটি আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কিরেন রিজিজু অভিযোগ করেছেন, সংগঠনটি পাকিস্তান ও তথাকথিত ‘ভারতবিরোধী গোষ্ঠী’ থেকে সমর্থক সংগ্রহের চেষ্টা করছে। মে মাসের মাঝামাঝি যাত্রা শুরু করার পর সংগঠনটির ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মোদির ১২ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অনলাইন প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
তরুণদের উচ্চ বেকারত্ব, বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং লাখো শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে পড়ার মতো বিষয়গুলো সংগঠনটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে মোদির দল জয় পেলেও সংগঠনটির উত্থান তার জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও গ্যাস সংকট নিয়ে জনঅসন্তোষও বাড়ছে।
ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও তাদের জন্য কৃষিখাতের বাইরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি এখনো দেশটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এপ্রিল মাসে শহরাঞ্চলের তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ১৪ শতাংশ ছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণীও কম বেতনের বা অনিশ্চিত চাকরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সূত্র: ডন