উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছিলেন মাহমুদুর রহমান সৈকত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত কলেজে ভর্তির সুযোগও পেয়েছিলেন। হতে চেয়েছিলেন প্রকৌশলী। তার মা-বাবাও তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু পুলিশের ছোড়া একটি গুলিতে সব স্বপ্ন নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলার সময় গত ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সৈকত।
মাহবুবে রহমান ও আফরোজা রহমান দম্পতির সন্তান মাহমুদুর রহমান সৈকত। সৈকতকে হারিয়ে তারা এখন নির্বাক। এখনো ছেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি মা আফরোজা রহমান। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান দুই বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি ও শাহরিনা আফরোজ সুপ্তি।
বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সৈকতের ছবি হাতে নিয়ে বিচারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কর্মসূচি শহিদি মার্চে এসেছিলেন সৈকতের বাবা-মা-বড় বোন এবং পরিবারের দুই সদস্য। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে দেখা পাই তাদের। শুরুতে সৈকতের মা আফরোজার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। এখনো শোকে পাথর তিনি।
তবে বুকে পাথর বেঁধেই খবরের কাগজকে ছেলের মৃত্যুর বর্ণনা দেন সৈকতের বাবা মাহবুবে রহমান।
তিনি বলেন, “১৯ জুলাই আমি একটি কাজে ঢাকার বাইরে যাই। জানতে পারি ঢাকায় গণ্ডগোল চলছে। সৈকতকে ফোন দিয়ে বলি, আব্বু তুমি কোথায়? বাসায় চলে যাও। তখন ছেলে বলে, ‘আমার এক বন্ধু গুলি খেয়েছে, আমি তার সঙ্গে আছি।‘ পরে আবার তাকে ফোন করি কিন্তু আর পাই না। অনেকক্ষণ পর আমাকে একজন ফোন করে বলে, আপনার ছেলে মারা গেছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেই ফোনের পর ভাগনে, ভাই, মেয়েজামাইকে জানাই যে সৈকত গুলি খেয়েছে তাড়াতাড়ি সেখানে যাও। তারা গিয়ে সেখানে সৈকতের লাশ পায়।”
একমাত্র ছেলেকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল মাহবুবের, কিন্তু সেসব আজ অতীত। ছেলেহারা মাহবুবে বলেন, ‘প্রত্যেক বাবা-মায়েরই তো সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে, আমাদের ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত কলেজে ভর্তির সুযোগও পেয়েছিল। সৈকত চাইত কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে, কিন্তু সেই সব আর হলো কই!’
বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বিচার দাবি করি। এখানে তো শুধু একজন খুন করেনি। অর্ডার বাই অর্ডার এই খুন করা হয়েছে। যেখানে শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে অনেকেই জড়িত। পুলিশের যে এসআই আমার ছেলের ওপর গুলি চালিয়েছে, তার সন্ধান পেয়েছি। তার নাম শাহরিয়ার কবির। আমরা মামালা করেছি, আমি প্রত্যেকেরই শাস্তি এবং ফাঁসির আদেশ চাই। এ ছাড়া যারা এই আন্দোলনে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের প্রত্যেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে শহিদের মর্যাদা দেওয়ার স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছি।’
সৈকতের বড় বোন শাহরিনা আফরোজ সুপ্তিও এসেছিলেন শহিদি মার্চে। তার দাবিও একই, ভাই হত্যার বিচার। সুপ্তি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সৈকত তো আমাদের একমাত্র ছোট ভাই। আমার ভাইকে যারা খুন করেছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি হোক। এ ছাড়া যারা মারা গেছেন, রাষ্ট্র যেন তাদের শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।’
সুপ্তির কথা শেষ হওয়ার পর ফের কথা হয় সৈকতের বাবা মাহবুবে রহমানের সঙ্গে। ছেলেকে হারিয়ে শোকের মধ্যেও গর্বিত এই পিতা।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেসহ অনেক বাবা-মায়ের সন্তান রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশকে নতুন করে স্বাধীন করেছে, এটা তো অনেক গৌরবের।’