রাজধানীর চানখাঁরপুলে গত ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাস হত্যাসহ গণহত্যার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হয়েছে।
বুধবার (২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ আবেদন করেন আনাসের নানা সাইদুর রহমান খান বাদল।
এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, তারা আনাসের মতো শিশুদের হত্যার ঘটনাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করবেন।
তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট গেন্ডারিয়ার বাসা থেকে গোপনে বেরিয়ে চানখাঁরপুলে আন্দোলনে যোগ দেয় দশম শ্রেণির ছাত্র আনাস। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় সে। আমরা কিছু ভিডিও পেয়েছি, কীভাবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন সেখানে অলিতে-গলিতে ঢুকে গুলি করেছে। আনাস বাসা থেকে গোপনে বের হওয়ার সময় তার স্কুলের খাতায় বাবা-মায়ের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে আসে। চিঠিতে সে বলে, আমি যদি বেঁচে না ফিরি, তবে গর্বিত হইয়ো। জীবনে প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই।’
৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ নিয়ে মোট ৩১টি অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হলো। এর মধ্যে ১৩টি চিফ প্রসিকিউটর বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো তদন্ত সংস্থায় দাখিল করা হয়।
আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ
জুলাই-আগস্টে গণহত্যার সরাসরি হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
বুধবার চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বরাবর এ অভিযোগ দাখিল করেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ।
অভিযোগে বলা হয়, হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দল- সাম্যবাদী দল, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, জাসদ (ইনু), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, তরীকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাসদ ও জাতীয় পার্টি-জেপি গণহত্যায় সরাসরি জড়িত। তাই অপরাধী সংগঠন হিসেবে তদন্তপূর্বক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এর আগেও আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে পৃথকভাবে ১৪ দলের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম অভিযোগ।
সাবেক সেনাপ্রধানসহ ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ
সাবেক সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিনসহ ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ করা হয়েছে। অপর ২ কর্মকর্তা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে জে (অব.) মো. আকবর হোসেন ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মে জে (অব.) মো. সরোয়ার হোসেন। এতে আরও ৩-৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
গত সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় এই অভিযোগ দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন। তিনি এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর গুম-সংক্রান্ত কমিশনের কাছেও একই অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে বলা হয়, তিনি ২০ বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করার পরে, ২০০৭ সালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ২০০৮ সাল থেকে সুশাসন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে কথা বলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা স্বৈরাচারের দোসর, গুম-খুনের হোতা, আয়নাঘরের সৃষ্টিকারী এবং রক্ষণাবেক্ষণকারী। তারা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংস, ভিন্নমত দমন করে রেখেছিল। তিনি যেহেতু গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকারের জন্য কথা বলেন এবং ফ্যাসিস্ট রেজিমের সমালোচনা করেন, সে জন্য তারা সরোয়ারের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। আসামিরা তাকে (ব্যারিস্টার সরোয়ার) অত্যাচার, ক্রসফায়ার বা গুম করার সুযোগ খুঁজছিল। আকবর হোসেন ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক থাকাকালে ২০১৩ সালের অক্টোবরে তাকে ৯টি মামলায় শোন এরেস্ট দেখান। একাধারে তাকে ৬ মাস কারান্তরীণ রাখা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেন একটি লিগ্যাল নোটিশের জবাব দেওয়ায় আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে গুম করার উদ্দেশে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর চা খাওয়ার কথা বলে ডিজিএফআই সদর দপ্তরে ডেকে নিয়ে যান। আসামিরা ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাশীল। ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের ক্রসফায়ার করা, গুম-খুন করা ছিল তাদের নেশা ও পেশা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করে, মানবাধিকার অপরাধ করে সেনাপ্রধান হিসেবে পদোন্নতি পান এস এম সফিউদ্দিন। সেনাপ্রধান হিসেবে ২০২৪ সালে পাতানো নির্বাচনে সহযোগিতা করে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন। এ ছাড়া আকবর হোসেন ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পদে ডিজিএফআইয়ে চাকরি করেছেন। অগণিত মানুষকে আয়নাঘরে বন্দি করে রেখেছিলেন। অনেক মানুষকে ক্রসফায়ার করেন, যা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। আকবর হোসেন ঘৃণিত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পাতানো নির্বাচনে সহায়তা করে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন। তিনি ছিলেন পতিত স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর। মে জে (অব.) মো. সরোয়ার হোসেন ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত নিজেকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার লোক বলে পরিচয় দিতেন। ২০০৯ সালের পর হঠাৎ তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী হয়ে অতি আওয়ামী লীগ সেজে বসেন। ২০১৫-১৬ সালে ডিজিএফআইয়ের পরিচালক থাকাকালীন গুম, খুনসহ নানাবিধ মানবাধিকার অপরাধ সংঘটিত করেছেন এবং সহযোগিতা করেছেন। তিনিও ছিলেন পতিত স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর।
ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন তার অভিযোগে উল্লেখ করেন, ‘আটক অবস্থায় তাকে ভয়ভীতি প্রদান করেন মে জে (অব.) মো. সরোয়ার হোসেন। আসামিরা বলেন ব্যারিস্টার সরোয়ারের মুখ এমনভাবে বন্ধ করা হবে, যাতে আর কোনো দিন কথা বলতে না পারেন। আসামিরা তাকে (ব্যারিস্টার সরোয়ার) আয়নাঘরে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। ১১ ঘণ্টা গুম থাকার পর তাকে (ব্যারিস্টার সরোয়ার) ছেড়ে দেন। গুমের ঘটনায় আসামিদের শাস্তিসহ ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করেন ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন।’