আড়াই শ শয্যার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১২০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে অর্ধেকই আসেন চর্ম ও যৌন বিভাগে। অথচ বিপুল সংখ্যক এই রোগীর চিকিৎসাসেবার দায়িত্বে আছেন মাত্র দুজন চিকিৎসক! এতে সেবাপ্রার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। কখনো দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তারা চিকিৎসক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। এতে নিম্ন আয়ের রোগীরা পড়েছেন বিপাকে। এ ছাড়া শত শত রোগী দেখতে গিয়ে চিকিৎসকরাও ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেবাপ্রার্থীদের দাবি, তাদের কথা চিন্তা করে হলেও এই বিভাগে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো হোক। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি একজন চিকিৎসক সেখানে যোগদান করেছেন। ভোগান্তির পরিমাণ এখন কমে আসবে।
গত শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগের নিচতলায় ১০২ নম্বর কক্ষের সামনে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। নারী ও পুরুষ আলাদা দুটি লাইনে চিকিৎসক দেখাতে অপেক্ষা করছেন। এ ছাড়া দোতলায় একজন নারী চিকিৎসক শুধু নারীদের চর্ম ও যৌন রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল ১০২ নম্বরে কক্ষের সামনে। সেখানে দুপুর ১টা পর্যন্ত রোগীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এ সময় অনেককে টিকিট না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়। আবার অনেকে দেরির কারণে বিরক্ত হয়ে লাইন থেকে বেরিয়ে যান।
এ সময় কথা হয় কয়েকজন রোগীর সঙ্গে। তাদেরই একজন বহদ্দারহাটের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। জেনারেল হাসপাতালে চর্মরোগের ভালো চিকিৎসা হয় জানতে পেরে তিনি এখানে এসেছেন। কিন্তু এসে শোনেন পুরুষ রোগীদের মাত্র একজন চিকিৎসক দেখেন। বলেন, ‘সকাল ৮টায় এসেছি। এখন দুপুর ১টা হতে চলল। এখনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি। একটু একটু করে লাইন এগুচ্ছে। একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এখানে এত ঝামেলা হবে জানলে আসতামই না।’
নগরীর বায়েজিদ থেকে আয়শা আক্তার তার সাড়ে সাত বছরের সন্তানকে নিয়ে এসেছেন সকাল ৯টায়। আগে এলে আগে দেখাতে পারবেন এমন চিন্তায় সকাল সকাল এলেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিনি চিকিৎসক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। বলেন, ‘সেবা নিতে এসে তিনটি লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। একবার টিকিটের জন্য, একবার চিকিৎসক দেখাতে, আরেকবার ওষুধ নিতে। তাও সব ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না।’
মাদ্রাসাছাত্র সাজিদের বাড়ি নগরীর মিয়াখান নগরে। ক্লাস-কোচিং বন্ধ রেখে এসেছিলেন ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসকের দেখা পারেননি। ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। এরপর আবার ওষুধের জন্য লাইন ধরতে হবে। আজকে আমার কোচিং, ক্লাস সব শেষ।’
সেখানে থাকা তাহসিন নামে আরেকজন সেবাপ্রত্যাশী বলেন, ‘চর্ম-যৌন বিভাগে যে পরিমাণ পুরুষ রোগী আসেন তাতে এখানে অন্তত তিনজন চিকিৎসক দরকার। কিন্তু আছেন মাত্র একজন। অনেকক্ষণ পর পর সিরিয়ালে থাকা ১০ জনের টিকিট নেওয়া হয়। সেই ১০ জনকে এক এক করে দেখা হয়। ততক্ষণে সিরিয়ালে থাকা রোগীদের সংখ্যা আবারও বেড়ে যায়।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চর্ম ও যৌন বিভাগের শিশু ও পুরুষ রোগীদের জন্য যে দুজন চিকিৎসক আছেন তাদের মধ্যে কেউ ছুটিতে গেলেই ভোগান্তির পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কারণ তখন যিনি দায়িত্বে থাকেন তাকেই সব রোগীকে দেখতে হয়। সেবাপ্রার্থীরা এ বিভাগে চিকিৎসক বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার রোগীর চাপ বেশি থাকায় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাই এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি।
টিকিট কাউন্টারে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন চর্ম ও যৌন বিভাগে অন্তত ৫০০ রোগী আসেন। এই বিভাগেই রোগীর চাপ থাকে সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮০০-১২০০ রোগী আসেন। সে হিসেবে সেবাপ্রার্থীদের অর্ধেকই চর্ম ও যৌন রোগী।
জানতে চাইলে হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মান্নান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের অনুমোদিত চর্ম ও যৌন রোগের চিকিৎসক মাত্র একজন। এতদিন পদটি খালি থাকলেও সম্প্রতি একজন যোগদান করেছেন। এখন চর্ম ও যৌন বিভাগে চিকিৎসকের সংখ্যা তিনজনে দাঁড়াবে। আশা করি এখন ভোগান্তি কিছুটা কমবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোগীর চাপ বেশি তাই একটু ভোগান্তি হয়। প্রতিদিন ৩০০-এর বেশি রোগী এই বিভাগে চিকিৎসা নেন।’