বগুড়া জেলা কারাগারের ছাদ ছিদ্র করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ কয়েদির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, কারাগার কর্তৃপক্ষ ও গণপূর্ত বিভাগ পৃথক চারটি কমিটি করে তদন্ত করার জন্য। এর মধ্যে গণপূর্ত বিভাগের গঠিত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কারাগার কর্তৃপক্ষ ঘটনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির সদস্যদের কাছে বক্তব্য দিয়েছে। যদিও তারা এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। তবে গণপূর্ত বিভাগ গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন ও কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের কয়েকটি বিষয় বেশ সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
কারাগার কর্তৃপক্ষের দাবি, জাফলং সেলের ছাদে করা বৃত্তাকার (১০ ইঞ্চি বাই ১৩.৫০ ইঞ্চি) ছিদ্র দিয়ে গত বছরের ২৫ জুন রাতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত চার কয়েদি পালিয়ে যান। তারা হলেন কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দিয়াডাঙ্গা এলাকার নজরুল ইসলাম ওরফে মজনু (কয়েদি নম্বর ৯৯৮), নরসিংদীর মাধবদী উপজেলার ফজরকান্দি এলাকার আমির হোসেন (কয়েদি নম্বর ৫১০৫), বগুড়ার কাহালু পৌরসভার মেয়র আবদুল মান্নানের ছেলে মো. জাকারিয়া (কয়েদি নম্বর ৩৬৮৫) এবং বগুড়ার কুটুরবাড়ি পশ্চিমপাড়া এলাকার ফরিদ শেখ (কয়েদি নম্বর ৪২৫২)। পালিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের চেলোপাড়া থেকে তাদের আবারও গ্রেপ্তার করা হয়।
জানা যায়, কারাগারের কনডেম সেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি একসঙ্গে ছিলেন ২৫ দিন। সেখান থেকেই তারা ছাদ ফুটো করে পালানোর পরিকল্পনা করেন। প্রথমে তারা বাইরে থেকে ছাদ ফুটো করার যন্ত্র সংগ্রহ করেন। ছাদ ফুটো করার পর একাধিক বিছানার চাদর গিঁট দিয়ে রশি হিসেবে ব্যবহার করেন। সেই রশি দিয়েই কনডেম সেল থেকে বের হয়ে প্রাচীর টপকে পালিয়ে যান তারা।
ছাদের ছিদ্রের আকার এবং অভিযুক্ত কয়েদিদের শরীরের মাপ নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। ওই ছিদ্রপথে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে? ঘটনার সময় বগুড়া কারাগারে দায়িত্বে ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিকে গ্রেপ্তার কয়েদিরা জানান, তারা ছিদ্রপথেই কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন। ওই সময়ের ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে আছে। ঘটনার সময় কারাগারে বিদ্যুৎ ছিল না। তাৎক্ষণিক কোনো ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘কারাগার কর্তৃপক্ষ ঘটনার অনেক আগে থেকেই ওই কক্ষকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করতে নানাভাবে চেষ্টা করেন। সেলের ভেতর লোহার রডের টুকরা পেরেকের মতো বানিয়ে দেয়ালের ভেতর বসিয়ে সিঁড়ি তৈরি করা হয়। কোনো শব্দ ছাড়াই লোহার রডের টুকরা দেয়ালে বসানো সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারাগার কর্তৃপক্ষের দাবি, কয়েদিদের কাছে থাকা বালতির ধাতব হাতলটি দিয়ে ৮ ইঞ্চি পুরু ছাদ ছিদ্র করা হয় তিন দিনে। কিন্তু ছাদের নির্মাণসামগ্রীর যে মান তাতে বালতির লোহার হাতল দিয়ে ছাদ ছিদ্র করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করছেন প্রকৌশলীরা। ওই সেলের ছাদ পরীক্ষার জন্য ছোট একটি ছিদ্র বানাতে প্রকৌশলীদের ৩৫ মিনিট সময় লেগেছে। ব্যবহার করতে হয়েছে ছেনি ও ভারী হাতুড়ি।
গণপূর্ত বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘কারাগারে তখন কর্মরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়েই বৃত্তাকার ছিদ্রের মাপ নেওয়া হয় এবং সংগ্রহ করা নির্মাণসামগ্রীর নমুনা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষার ফলাফলের মান ‘সন্তোষজনক’ বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বেশ কয়েক বছর আগে আসামি ও কয়েদিদের আটকে রাখতে ওই সেলের ওপর বসানো হয় লোহার জাল, যা বেষ্টনীপ্রাচীর পর্যন্ত ছিল। তখন বলা হয়েছিল জাল না তৈরি করলে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা‘আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) সদস্যদের হেলিকপ্টারের সাহায্যে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারে তাদের সহযোগীরা।
সেই আশঙ্কা থেকে ওই সেলের ওপর তখন লোহার খাঁচা বসানো হয়। হেলিকপ্টার দিয়ে কারাগার থেকে কয়েদিদের কেন নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল তার কোনো জুতসই বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কারাগারের ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘লোহার তৈরি ওই জাল না থাকলে সেল থেকে বের হলেও কারাগার থেকে বের হতে পারতেন না কয়েদিরা। আর এসব কারণে অনেকেই সন্দেহ করছেন, কয়েদিদের বের হওয়ার বিষয়টি সুপরিকল্পিত। সংশ্লিষ্টদের সহযেগিতা না থাকলে তারা বের হতে পারতেন না।
বগুড়া জেলা কারাগারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুর্ধর্ষ এবং হত্যা মামলায় ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের বিষয়ে সব সময়ই কঠোর নজরদারি থাকে। কিন্তু পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের ক্ষেত্রে সেই নজরদারি ও সতর্কতা ছিল না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কারাগার কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি থাকার পরেও গণপূর্ত বিভাগ কেন পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করল তাও স্পষ্ট নয়। এক প্রশ্নের জবাবে গণপূর্ত বিভাগের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অভিযোগ করা হয়, কয়েদি পালানোর ঘটনায় বগুড়া কারাগারে কর্মরত কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল এবং তারা অদক্ষ। এসব অভিযোগ তদন্ত করতেই গণপূর্ত বিভাগ তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে।