বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পুনর্গঠন করে তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) গঠনের সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। চেয়ারম্যানসহ প্রতিটি কমিশনের সদস্য ৮ জন রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তাতে। গতকাল বুধবার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং প্রতিবেদনের নির্বাহী সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনের নির্বাহী সারসংক্ষেপে দেশের পুরোনো চারটি বিভাগকে চার প্রদেশে বিভক্ত করা, কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠনের প্রস্তাব, জেলা পরিষদ বাতিল, পৌরসভা শক্তিশালীকরণ, উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করা, ইউনিয়ন পরিষদের সংস্কার, ইউনিয়ন পরিষদকে অধিক দায়িত্ব দেওয়া, সরকারি চাকরিজীবীদের ১৫ বছর চাকরি শেষে পেনশনসহ স্বেচ্ছায় অবসর, ডিসি-ইউএনওদের পদবি পরিবর্তনের সুপারিশসহ সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার সুবিধা বাতিলের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) আওতায় একীভূত ‘ক্যাডার’ সার্ভিস বাতিল করে তার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সার্ভিসের কাজের ধরন ও বিশেষায়িত দক্ষতার বিষয়টি সামনে রেখে আলাদা আলাদা নামকরণ করা যেতে পারে।
বিদ্যমান বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারকে ১২টি প্রধান সার্ভিসে বিভক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো বাংলাদেশ প্রশাসনিক সার্ভিস, বাংলাদেশ বিচারিক সার্ভিস, বাংলাদেশ জননিরাপত্তা সার্ভিস, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সার্ভিস, বাংলাদেশ হিসাব সার্ভিস, বাংলাদেশ নিরীক্ষা সার্ভিস, বাংলাদেশ রাজস্ব সার্ভিস, বাংলাদেশ প্রকৌশল সার্ভিস, বাংলাদেশ শিক্ষা সার্ভিস, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস, বাংলাদেশ কৃষি সার্ভিস এবং বাংলাদেশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সার্ভিস।
নতুন তিনটি কমিশন হবে ১. পাবলিক সার্ভিস কমিশন (সাধারণ): শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ছাড়া অন্য সব সার্ভিসে নিয়োগ ও পদোন্নতি পরীক্ষা। ২. পাবলিক সার্ভিস কমিশন (শিক্ষা): শুধু শিক্ষা সার্ভিসে নিয়োগ ও পদোন্নতি পরীক্ষা। ৩. পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য): শুধু স্বাস্থ্য সার্ভিসে নিয়োগ ও পদোন্নতি পরীক্ষা। শিক্ষা সার্ভিস ও স্বাস্থ্য সার্ভিসের কর্মকর্তারা অন্যান্য সার্ভিসের সঙ্গে সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসে অন্তর্ভুক্তির পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন বলে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
দেশের পুরোনো চারটি বিভাগকে চার প্রদেশে বিভক্ত করার সুপারিশ
ক্ষমতা ও পরিষেবাব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে দেশের পুরোনো চারটি বিভাগের সীমানাকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।
এ বিষয়ে বলা হয়, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরকারের কার্যপরিধি সুবিস্তৃত হওয়ায় বর্তমান প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার কাঠামো যথেষ্ট নয় বলে প্রতীয়মান হয়। এতে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালু হলে এককেন্দ্রিক সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ কমবে এবং রাজধানীর ওপর চাপ কমবে।
কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠনের প্রস্তাব
‘জনমুখী প্রশাসনের লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পুনর্গঠন’ শিরোনামে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন দুটি বিভাগ গঠনের সুপারিশ করেছে কমিশন।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে মোট ৮টি প্রশাসনিক বিভাগ রয়েছে। ভৌগোলিক ও যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় কুমিল্লা এবং ফরিদপুর বিভাগ গঠনের দাবি অনেক দিনের। তা ছাড়া জনসংখ্যা ও যোগাযোগ বিবেচনায় ১০টি বিভাগকে পুনর্বিন্যাস করার প্রস্তাবের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছে কমিশন।
জেলা পরিষদ বাতিল
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কখনোই নাগরিকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হননি। কিছু জেলা পরিষদ বাদে অধিকাংশেরই নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের শক্তিশালী উৎস নেই। ফলে তারা আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নন। তাই বাতিল করে জেলা পরিষদের সহায়-সম্পদ প্রস্তাবিত সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকারকে হস্তান্তর করা যেতে পারে।
পৌরসভা শক্তিশালী করা
পৌরসভার গুরুত্ব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার হিসেবে একে অধিকতর শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে। একবার নির্বাচিত হয়ে মেম্বারদের গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে ওয়ার্ড মেম্বারদের ভোটে পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করা
উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদ বাতিল করে স্থানীয় সরকার হিসেবে উপজেলা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) উপজেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত না রেখে তাকে শুধু সংরক্ষিত বিষয় ও বিধিবদ্ধ বিষয়াদি যেমন আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ইত্যাদি দেখাশোনার ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ইউএনওকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখা যাবে। একজন সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার অফিসারকে উপজেলা পরিষদের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে বলে প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন।
ভূমি ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে উপজেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় শ্রেণির একজন ভূমি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কর্মরত কানুনগোদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অধীনে তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন করা যেতে পারে। এরূপ পদোন্নতির পরীক্ষা পিএসসির মাধ্যমে হতে হবে। পরে পদোন্নতি পেয়ে তাদের ২৫ শতাংশ সহকারী কমিশনার (ভূমি) হতে পারবেন।
ইউনিয়ন পরিষদের সংস্কার
ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে ৯-১১ করা যেতে পারে বলা হয়েছে প্রতিবেদনের সুপারিশে। প্রতিটি ওয়ার্ডে দুজন সদস্য নির্বাচিত হবেন, যাদের একজন অবশ্যই নারী হতে হবে এমন বিধান তৈরির কথা বলেছে কমিশন। এর ফলে একদিকে নারীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব এবং তাদের কর্ম এলাকা সুনিশ্চিত হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন মেম্বারদের ভোটে।
ইউনিয়ন পরিষদকে অধিক দায়িত্ব দেওয়া
উপানুষ্ঠানিক ও মসজিদভিত্তিক উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদকে দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কৃষি, পানি, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্য কমিটিগুলো গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে যে গ্রাম আদালত বা সালিশি ব্যবস্থা রয়েছে তাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা হলে গ্রাম পর্যায়ে মামলা-বিরোধ ইত্যাদি কমে আসবে বলে মনে করে কমিশন।
১৫ বছর চাকরি করলে পেনশনসহ অবসর দেওয়ার প্রস্তাব
একজন সরকারি কর্মচারীর ১৫ বছর চাকরির পর পেনশন সুবিধাসহ অবসর নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এতে বলা হয়েছে, এটি কর্মজীবন পরিবর্তনের জন্য বেছে নেওয়া কর্মকর্তাদের জন্য চাকরি থেকে চলে যাওয়ার সুবিধা দেবে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা ২৫ বছর চাকরি করার পর অবসরে গেলে পেনশনসহ সব অবসর সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধি করার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রা ব্যয় বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদত্ত ইনডেক্স বিশ্লেষণ করে মূল বেতন প্রতিবছর বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তবে তা ৫ শতাংশের বেশি হবে না। এ জন্য একটি স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রথা বাতিল এবং বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) না করার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন নিশ্চিত করতে ‘পাবলিক সার্ভিস অ্যাক্ট, ২০১৮’-এর ধারা ৪৫ বিধান অনুসারে ২৫ বছর চাকরির পর সরকার ইচ্ছে করলে কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর দিতে পারে বলে যে বিধান রয়েছে, তা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। তা ছাড়া সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে ওএসডি না করা এবং কোনো ওএসডি কর্মকর্তাকে কাজ না দিয়ে বেতন-ভাতা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে শিক্ষকতা বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাময়িকভাবে পদায়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিসি-ইউএনওদের পদবি পরিবর্তন চায় কমিশন
জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) পদবি পরিবর্তন চায় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জেলা প্রশাসক’ ও ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসার’ পদবি পরিবর্তন করে যথাক্রমে ‘জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কমিশনার’ ও ‘উপজেলা কমিশনার’ করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আর ‘অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)’ পদবি পরিবর্তন করে ‘অতিরিক্ত জেলা কমিশনার (ভূমি ব্যবস্থাপনা)’ করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে কমিশন।
সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার সুবিধা বাতিলের সুপারিশ
কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য ও সরকারের খরচ কমাতে উপসচিব থেকে ওপরের স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সচিবালয়ের উপসচিবদের গাড়ি কেনার ঋণ এবং গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ সুযোগ সচিবালয়ের বাইরে অন্য সার্ভিসের কর্মকর্তাদের জন্য নেই। তাই এটি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যবস্থাটি বাতিল করলে কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য দূর হবে এবং সরকারের খরচও কমবে বলে মত দিয়েছে সংস্কার কমিশন।