সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। গত ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পরও গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মুদ্রানীতি এবং রাজস্বনীতির মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা নিরসনে সরকার কাজ করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান থাকায় বর্তমানে বিদ্যুৎ এবং সারের ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় যমুনায় ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি: সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’বিষয়ক এ সভায় অর্থনীতি বিষয়ে ওপরের ওই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, অর্থসচিব ড. মোহাম্মদ খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরা।
বৈঠকের শুরুতে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। চলতি অর্থবছর (২০২৪-২৫) জুলাইতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। জানুয়ারিতে কিছুটা কমে ৯.৯৪ শতাংশ হয়। অন্যদিকে ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২.৯২ শতাংশ থাকলেও জানুয়ারিতে তা নেমে আসে ১০.৭২ শতাংশে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বর্ণনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং সহায়ক রাজস্বনীতি গ্রহণ করা হয়েছে। নীতি সুদের হার ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। চাল, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক অব্যাহতি বা হ্রাস করে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের জেলা শহরে ওএমএসের মাধ্যমে ডিসেম্বর মাসে সুলভে সবজি বিক্রি করা হয়েছে, দেশের ১ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুলভমূল্যে পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি জেলায় ১০ সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রমজানে ট্রাকে করে বিভাগীয় শহরগুলোতে তেল, চিনি, ডাল, খেজুর এবং ছোলা সুলভমূল্যে সরবরাহ করা হবে। আগামী এক মাসে বাজার নজরদারিতে বিশেষ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘পণ্য গুদামজাত করা ঠেকাতে আড়ত-হিমাগারসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (চাল, পেঁয়াজ, তেল, আলু ইত্যাদি) গুদামে নিবিড় নজরদারি করা হবে। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করা হবে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করা হবে।’
প্রতিবদনে বর্তমান খাদ্য পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলা হয়েছে, সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্যের মজুত রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টন, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ২৩.৬ শতাংশ কম। মজুত ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে চলতি অর্থবছরে আরও ৯ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মাঠপর্যায়ে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর পদ্ধতি দ্রুত খুঁজে বের করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চাষিদের জন্য অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে।’
প্রতিবেদনে সব ধরনের টাকা ছাপানো বন্ধ রাখা হয়েছে জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘কম গুরুত্বপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাতিলসহ সরকারি খরচ কমানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কৃষি ও খাদ্যদ্রব্য মজুত বা সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে গুদাম বা হিমাগারের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।’
প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার মাধ্যমে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ খনন করে দৈনিক ৬৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে কাজ চলছে।’
রাজস্ব আহরণের গতিধারা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘ সময় ধরে ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে। করদাতাবান্ধব পরিবেশ ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে আয়কর বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কর ব্যয় কমাতে ছয়টি কর অব্যাহতির এসআরও বাতিল করা হয়েছে। আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিলের জন্য অনলাইন রিটার্ন প্ল্যাটফর্মকে নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে। আয়কর বিভাগের সম্প্রসারণ করে ১০টি কর অঞ্চল, ৩টি বিশেষ ইউনিট কার্যক্রম শুরু করেছে।’
ভ্যাট বাড়াতে এ বিষয়ের আইন ও বিধিবিধান পদ্ধতি সহজ করতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা ও ব্যাখ্যাপত্র জারি করা হয়েছে। অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল শতভাগ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
ভ্যাট আদায় বাড়াতে তালিকাভুক্তির সীমা ৫০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা এবং নিবন্ধন সীমা ৩ কোটি থেকে ৫০ লাখ টাকা কমানো হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে ও সরবরাহ পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের কারণে আর্থিক খাত উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিগত সরকারের সময় আর্থিক খাতের অব্যবস্থার কারণে অন্তত ১০টি ব্যাংক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এ বিষয়ে সংকট উত্তরণ নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাস্কফোর্স গঠন করে ব্যাংকের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় নিয়ে প্রতিবদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-জানুয়ারি) বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯.৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় এবং শ্রমশক্তি রপ্তানি বাড়ায় প্রবাসী আয়ের গতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবর-জানুয়ারি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে প্রেরণ করা সম্ভব হয়েছে।
শিল্প খাতের চ্যালেঞ্জ বর্ণনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেক্সিমকো গ্রুপের টেক্সটাইলসহ অন্যান্য কারখানার প্রায় ৪০ হাজার কর্মচারীর সহিংস আন্দোলনে রাস্তা অবরোধসহ আশপাশের অন্যান্য শিল্পকারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করায় সেগুলো ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যেসব কারখানার মালিক পলাতক রয়েছেন বা দুর্নীতি/অর্থ পাচারের অভিযোগে বিদেশে চলে গিয়েছেন, তাদের মালিকানাধীন কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বা নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে না পারায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে। স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় শিল্পাঞ্চলে প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র আন্দোলনের মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের আগস্ট মাসের বেতন-ভাতা প্রদান নিশ্চিত করতে ব্যাংক কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চলতি মূলধন ঋণসীমার বাইরে মেয়াদি ঋণ সুবিধা প্রদানে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের অসন্তোষ নিরসনসহ স্থিতাবস্থার স্বার্থে চলতি অর্থবছরের পরিচালন বাজেট থেকে বেক্সিমকো গ্রুপকে ৫০ কোটি টাকাসহ আরও ৩টি প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ৮৭ কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। আরও ১টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বেক্সিমকোর শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে কারখানা বন্ধ করে সম্পদ বিক্রয়পূর্বক শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ করতে কাজ চলছে।
প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্বল্প মেয়াদে অর্থনীতি কিছুটা প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলেও ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সুচিন্তিত মুদ্রানীতি এবং রাজস্বনীতির ফলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং শ্রমিক অসন্তোষ স্বল্প মেয়াদের ক্ষেত্রে অন্যতম ঝুঁকি।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সংবাদ সম্মেলন
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘অর্থনীতির গতিধারা নিয়ে আজকের (গতকাল) সভায় অধ্যাপক ইউনূস অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি আরও ভালো করতে বলেছেন।’
গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস ইউং আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
শফিকুল আলম বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন যে আমরা খুব বাজে অবস্থায় ছিলাম, সেই জায়গা থেকে এখন ভালো জায়গায় আসছি। তবে আরও ভালো জায়গায় নিতে হবে, এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ।’
শফিকুল আলম বলেন, বেক্সিমকোর যে জটিলতা রয়েছে, তার সুষ্ঠু সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেছেন, ‘প্রবাসী আয়ে ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এখনই এটা নিয়ে উৎসব করার কিছু নেই। এ খাতে এখনো অনেক সম্ভাবনা রয়ে গেছে। প্রধান উপদেষ্টা এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।’
শফিকুল আলম জানান, সভায় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে যে বৈদেশিক রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে সাড়ে তিন মাসের বৈদেশিক দায় মেটানো সম্ভব। রিজার্ভের অবস্থা সামনে আরও ভালো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শফিকুল আলম বলেন, সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের সব সংস্থা এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
শফিকুল আলম বলেন, গভর্নর জানিয়েছেন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ঘুরে গেছে, সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশে আসছে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।