বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দিনে-দুপুরেও খুন-ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে বেড়েছে ধর্ষণসহ নারী-শিশু নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির ঘটনা। এসব কারণে বাধ্য হয়ে নাগরিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দাবিতে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
রবিবারও (২৩ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, দেশব্যাপী ছিনতাই, হামলা, ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে গেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার উদ্দেশে তারা বলেন, দেশের মানুষকে সুরক্ষা দিতে না পারলে পদত্যাগ করুন। এ ছাড়া ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই প্রতিরোধসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে আলটিমেটাম দিয়ে গতকাল বিক্ষোভ সমাবেশ করেন মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা। এ ছাড়া গতকাল আসাদ গেটে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা। ধর্ষণের বিস্তার ও রাষ্ট্রের বর্তমান বিশৃঙ্খলায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা না রাখার প্রতিবাদে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ইনকিলাব মঞ্চ। পাশাপাশি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় সন্ধ্যার পর মশাল মিছিলসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও গতকাল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। ঢাকার বাইরেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং টাঙ্গাইলে নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।
যদিও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য পুলিশ সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে। আরও কীভাবে পরিস্থিতির উন্নয়ন করা যায়, সে লক্ষ্যে আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।’
ঘটনা বিশ্লেষণে জানা যায়, সম্প্রতি টাঙ্গাইলে রাজশাহী রুটের একটি যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতি ও নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানি করার ঘটনা ঘটে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীরা। এ ছাড়া উত্তরা ও মগবাজারে গত সপ্তাহে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইকারী-সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল ভোরে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার জিরাবোতে নিজ বাড়িতে ডাকাতের হামলায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অভিনয়শিল্পী আজিজুর রহমান আজাদ। ডাকাতের আক্রমণে আজাদের মা ও স্ত্রীও আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। যৌথ বাহিনীর চলমান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ও নিয়মিত অভিযানের পরও অপরাধীরা কীভাবে এমন বেপরোয়া তৎপরতা চালাচ্ছে, সেটাও এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই জাতীয় পরিস্থিতিতে সাধারণত দুটি বিষয় কাজ করে। একটি হলো উদ্দেশ্যমূলক অপরাধ এবং অন্যটি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধ। তবে বিশেষ অভিযান (অপারেশন ডেভিল হান্ট) চললে একটা প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু সেখানে সেভাবে উন্নতি হয়তো দেখা যাচ্ছে না। যদিও এটার জন্য কিছুটা সময় লাগবে। তার পরও যেটা মনে হচ্ছে, পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব আছে। মাঠপর্যায়ের পর্যাপ্ত তথ্য ঘাটতি আছে। গোয়েন্দা তথ্য বাড়াতে হবে। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের বিকল্প নেই।’
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত জানুয়ারিতে সারা দেশে ৩৯ জন নারী-শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া গত বছরে তথা ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৪০১ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ‘গ্যাং রেপ’ বা গণধর্ষণের শিকার হন ১০৫ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৪ জনকে। অন্যদিকে গত মাসে পারিবারিক ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৪০ জন নারী, যার মধ্যে খুনের শিকার হন ২১ জন। গত জানুয়ারিতে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৪ জন। হয়রানির শিকারদের মধ্যে তিনজন পুরুষও রয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার সহকারী কমিশনার (এসি) মো. জাহাঙ্গীর কবির খবরের কাগজকে জানান, রাজধানীতে গত ডিসেম্বর মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে (থানায় মামলা অনুসারে) ৩৯টি এবং জানুয়ারিতে ৫৪টি। গত ডিসেম্বরে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৯টি এবং জানুয়ারিতে ঘটেছে ৮টি, চুরির ঘটনা ডিসেম্বরে ১২৬টি এবং জানুয়ারিতে ঘটেছে ১৪৬টি, হত্যাকাণ্ড গত ডিসেম্বরে ৪৬টি ও জানুয়ারিতে ৩৬টি। ডিসেম্বরে মোট ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার ৩৮৫ জন এবং জানুয়ারিতে ৭১৯ জন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশের সক্ষমতা এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি। মাঠপর্যায়ে নিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়ানোর বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো পুলিশের মধ্যে কী করব, কী করব না- এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। কিন্তু ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে তো দ্বিধার কিছু নেই। এখানে তো পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নিতেই পারে। ফলে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।’ তিনি বলেন, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ছাড়া এই জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা খুব কঠিন। তবে পুলিশ চেষ্টা করছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার।
এ বিষয়ে গতকাল রাত ৮টার দিকে মুঠোফোনে কথা হয় বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে সেটি একই রকম আছে। তবে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়েছে, সেটা আমরাও লক্ষ করছি। মাঝখানে সহনীয় মাত্রায় থাকলেও ইদানীং তাদের বাড়তি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এটার কারণে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। আমরা এসব নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছি। এরই মধ্যে র্যাবের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান নিয়ে গত শনিবার আমরা বৈঠক করেছি। ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে। এ লক্ষ্যে আজ (গতকাল রবিবার) থেকেই বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
জামিন নিয়ে অপরাধীরা আবারও জড়াচ্ছে একই অপরাধে: র্যাব ডিজি
সম্প্রতি কয়েক শ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হলেও তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান। গত শনিবার রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী টোলপ্লাজায় টহল ও চেকপোস্ট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে র্যাব মহাপরিচালক এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, পুলিশ-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধ দমনে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
শহিদুর রহমান বলেন, ‘ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। র্যাবের ঢাকার ৫টি ও ঢাকার বাইরের ১০টি ব্যাটালিয়ন নিয়ে আমরা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ছিনতাই, দস্যুতা, ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীগামী একটি যাত্রীবাহী নৈশবাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। মা-বোনের সম্ভ্রমহানির অভিযোগও আছে। ঢাকা শহরেও অনেক ক্ষেত্রে মা-বোনরা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি, এই অপরাধগুলো দমন করার জন্য। রাজশাহীগামী সেই নৈশবাসের ঘটনায় বেশ কয়েকজন দস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ-মশাল মিছিল
সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ, খুন, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে সরকারি ইডেন কলেজে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া গতকাল আসাদগেটে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা। গতকাল ইডেন কলেজে এই বিক্ষোভ সমাবেশ ও আসাদগেটে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ধর্ষণকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারে পুলিশের আশ্বাসে ৩ ঘণ্টা পর বেলা ২টার দিকে সড়ক ছেড়েছেন তারা।
ইডেনের সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘সম্প্রতি সারা দেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। নারী নির্যাতন রোধে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে নারীরা নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন। আমরা চাই, নতুন বাংলাদেশে কেউ যাতে আর ধর্ষণের শিকার না হন। আমরা চাই, ভাইয়েরা-বোনেরা একসঙ্গে আন্দোলন করবে, রাজপথে থাকবে, দেশ গড়বে।’
দেশজুড়ে অব্যাহতভাবে নারী ও শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদে টাঙ্গাইলে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়করা নারী ও শিশু যৌন নিপীড়ন ব্যানারে এ আন্দোলন করছেন।
এ সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আত্মার মাগফিরাত কামনা করা লেখাসংবলিত ফেস্টুন নিয়ে এ অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান তারা।
সারা দেশে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রতিবাদে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) বিক্ষোভ ও মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-১ নিচতলায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।
ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে বিক্ষোভ করেছেন রংপুরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় নেওয়ার দাবি জানান তারা। অন্যথায় আগামীতে বৃহৎ কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষার্থীরা।