দেশের ভয়াবহ বিপর্যয়গুলোর অন্যতম রানা প্লাজা ভবনের ধস। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে বহুতল রানা প্লাজা ধসে মারা যান ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক। এ ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন আরও দেড় হাজারেরও বেশি শ্রমিক। এই বিপর্যয়ের এক যুগ অতিক্রান্ত হলেও সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় মানবেতর দিনযাপন করছেন অনেকেই। শ্রম আইন ও ইমারত আইনে দায়ের করা প্রায় ডজনখানেক মামলা রয়েছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
রানা প্লাজার ধসে আহত শ্রমিকদের অভিযোগ, এত বড় ঘটনার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও তাদের খোঁজ রাখেননি কেউ। শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা নিয়ে তারা কর্মহীন হয়ে কষ্টে রয়েছেন। ন্যায্যবিচার ও ক্ষতিপূরণ আজও পাননি।
রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলার ইথার টেক্সের সুইং অপারেটর আহত নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘ঘটনার দিন ধসে পড়া ভবনের নিচে আমি চাপা পড়েছিলাম। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাওয়ার কারণে এখন কোনো কিছু মনে রাখত পারি না। মাথা সব সময় যন্ত্রণা করে। মেরুদণ্ডের হাড়ের ব্যথাতেও ভুগছি।’ আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিকাশে ১৫ হাজার টাকা করে তিনবার পেয়েছি। আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাইছি ৫৪ হাজার টাকা। আমাদের টাকা নিয়ে অনেক দুর্নীতি হইছে। আমাদের চিকিৎসা নিয়ে দুর্নীতি হইছে। নতুন সরকার আমাদের মেসেজ দিয়ে জানিয়েছে, কোনো টাকা নাই। এখনো কোনো হাসপাতালে গিয়ে আমরা সুকিচিৎসা পাই না। ন্যায্যবিচার ও ক্ষতিপূরণ আজও পেলাম না।’
মো. জালাল নামে আহত আরেক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা দোষীদের শাস্তি চাই। তা ছাড়া আর কী করব? কিন্তু বিচার তো নাই! এটা বলেই লাভ কী আর শুনেই লাভ কী?
রানা প্লাজার আহত শ্রমিক সালমা বেগম বলেন, ‘মেডিকেলে ভর্তি থাকার সময় অনেকেই ১-২ হাজার টাকা করে সহযোগিতা করেছিলেন। পরে বিকাশ অ্যাকাউন্টে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। এরপর থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা কিছুই পাই নাই। এখন বাসা ভাড়া দিতে পারি না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াটাও সেভাবে করাতে পারছি না। মাঝেমধ্যে না খেয়েও থাকতে হয়। উপায় না পেয়ে অল্প দামে কেনা একটু খারাপ সবজি আড়ত থেকে কিনে এনে রাস্তার পাশে বিক্রি করি। অনেক সময় পড়ে থাকা সবজিও কুড়িয়ে নিয়ে এসে বিক্রি করি। এভাবেই কোনো রকমে আমার সংসার চলতেছে।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের এক যুগ পার হলেও শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হয়নি। সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারও এখন পর্যন্ত করা হলো না। এ ঘটনার জন্য দায়ী ভবন মালিক রানাসহ কারখানার যারা মালিক, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমরা মনে করি, এই সরকার অন্তত রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করবে এবং হত্যাকাণ্ডের সুবিচার নিশ্চিত করবে।’
মামলার অগ্রগতি তদারকিতে কমিটি গঠনের দাবি
রানা প্লাজাসংক্রান্ত দায়ের করা মামলার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া চলমান মামলাগুলোর অগ্রগতি তাদরকিতে একটি আলাদা কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন মামলাসংশ্লিষ্টরা। এর পাশাপাশি ওই ঘটনায় আহতদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে।
বুধবার (২৩ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘রানা প্লাজা ভবন ধস: বিচারের অপেক্ষায় এক যুগ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব দাবি তুলে ধরেন।
লেবার ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এ সভার আয়োজন করে। সভায় বক্তব্য দেন ব্লাস্ট পরিচালক (আইন) মো. বরকত আলী, ঢাকার জেলা ও দায়রা আদালতের এপিপি মো. আবুল কালাম খান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদসহ আরও অনেকে।
আলোচ্য বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের আইনজীবী সিফাত-ই-নূর খানম। তিনি রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা ১১টি মামলার তথ্য জানিয়ে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তিতে করণীয় তুলে ধরেন।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, এক যুগ পরও নিহত শ্রমিকদের পরিবার এবং আহত শ্রমিকরা এখনো আইনানুগ ক্ষতিপূরণ পাননি। এ ক্ষেত্রে তাদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের দায়িত্ব নিয়ে সবার সচেতন এবং সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।