প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে হুমকির মুখে রয়েছে দেশের জীববৈচিত্র্য। বছর ঘুরে আবারও এসেছে বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস। কিন্তু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে দিবসকেন্দ্রিক তেমন কোনো আয়োজন নেই বন বিভাগের। ১৯৯২ সালের ২২ মে গৃহীত জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কনভেনশনের আলোকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। তবে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০১ সালে দিবসটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। এবারের প্রতিপাদ্য-‘প্রকৃতির সঙ্গে সংগতি ও টেকসই উন্নয়ন’।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি (২০৩০) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। কোনো একটি দেশ, তা যতই ধনী বা ক্ষমতাধর হোক না কেন, একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আবার তারা সেই বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি ছাড়াও বাঁচতে পারবে না, যা আমাদের এই পৃথিবীর সৌন্দর্য ও ভারসাম্য রক্ষা করে।’
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, নদীর নাব্য কমে যাওয়াসহ মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে হুমকিতে রয়েছে উপকূলীয় এলাকার জীববৈচিত্র্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে বার্ষিক বন উজাড় হওয়ার হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ; যা উদ্বেগজনক। বন বিভাগের হিসাবে গত ২০ বছরে সারা দেশে দখল হয়ে গেছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৩ একরের বেশি বনভূমি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমন্বিত পদক্ষেপ না থাকায় বনভূমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থার মধ্যে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। তবে বনবিভাগের দিবসকেন্দ্রিক কোনো কর্মসূচি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন অ্যাকাডেমির পরিচালক পরিবেশবিদ ফারুক আহমেদ বলেন, সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকার জীববৈচিত্র্য অনেক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এখন আমরা ময়না, কোকিল, বক, শালিক আগের মতো দেখি না। কচ্ছপ কম দেখি। অনেক প্রাণী বিপন্ন তালিকায়। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই ঝুঁকি কমাতে না পারলে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ থাকবে না। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে আন্তসম্পর্ক পরস্পর নির্ভরশীলতা ফিরিয়ে আনা গেলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। মানুষ যেমন প্রকৃতি ধ্বংসের জন্য দায়ী, তেমনি মানুষের চেষ্টাতেই প্রাণ ফিরে পেতে পারে প্রকৃতি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ ইউসুফ আল হারুন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি, দূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠমো উন্নয়নে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছে। নানা কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। মানুষ নিজের প্রয়োজনে গাছ কেটে ফেলছে। এতে বন উজাড় হচ্ছে। ফলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং খাল-বিল, নদ-নদী, সাগরের দখল এড়াতে নতুন আইন প্রয়োজন। একইভাবে সুন্দরবনের আশেপাশে অপরিকল্পিতভাবে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে যা পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এতে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। আইন না মেনে এসব স্থাপনা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনা বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে আলাদাভাবে কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। তবে মানুষকে নিয়মিত এ ব্যাপারে সচেতন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষ বেড়েছে। মানুষের চাপে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। গাছ মারা যাচ্ছে, প্রাণী মারা যাচ্ছে। ছোট একটি দেশে মানুষ বেড়ে যাওয়ায় পরিবেশের ক্ষতিও বাড়ছে।
তবে এখনই এ বিষয়ে সচেতন না হলে আগামী প্রজন্ম বড় ধরনের বিপত্তির মধ্যে পড়বে বলে মন্তব্য করেন পরিবেশবিদ ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করা বন বিভাগের মূল দায়িত্ব। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করতে পারি মাত্র। সরকার যদি এটাকে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব না দেয় তাহলে একদিন আমরা জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হারাব।