বিচারব্যবস্থা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে যেসব উপজেলা জেলা সদরের কাছাকাছি, সেসব উপজেলায় আদালত স্থাপনের বিপক্ষে মত দিয়েছে দলগুলো। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে সালিশি আদালত কার্যকর করা এবং তৃণমূলে সরকারের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার পক্ষে মত বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের।
সোমবার (৭ জুন) রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের ১০ম দিনের বৈঠকে এসব মতামত আসে।
আলোচনায় রাষ্ট্র সংস্কারে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও সংশোধনে একমত হয়েছে বিএনপি। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই নাগরিক মৌলিক অধিকার খর্ব না করার পক্ষে বাম দলগুলো। আলোচনায় সংস্কার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরবর্তী সংসদের ওপর ন্যস্ত না করার আহ্বান এনসিপির। ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংশোধিত আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিন দিন বিরতির পর সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হওয়া এই বৈঠক চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এতে আলোচ্য বিষয় ছিল- উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠকে অংশ নেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা।
কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়, উপজেলা সদরের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য, জেলা সদর থেকে দূরত্ব ও যাতায়াতব্যবস্থা, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বিন্যাস এবং মামলার চাপ বিবেচনা করে কোন কোন উপজেলায় স্থায়ী আদালত স্থাপন করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমানে যেসব উপজেলায় চৌকি আদালত পরিচালিত হয়, সেগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে সবগুলো চৌকি আদালতকে স্থায়ী আদালতে রূপান্তরিত করার প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে উপজেলা সদরে স্থাপিত কোনো আদালতের জন্য একাধিক উপজেলাকে সমন্বিত করে অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করার প্রয়োজন হলে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বিষয়ে আলোচনায় জনগণের স্বার্থে ৩৫ বছর আগের অবস্থান বিএনপি পরিবর্তন করেছে জানিয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১৯৯১ সালে জাতীয় মনোভাবের সঙ্গে একমত হয়ে বিএনপি উপজেলা পর্যায়ে থাকা আদালত তুলে দেয়। আগের সেই সিদ্ধান্তে কোনো আপত্তি জাতীয়ভাবে আসেনি। বিভিন্ন চৌকি আদালত ও দ্বীপাঞ্চল মিলিয়ে বর্তমানে যে ৬৭টি আদালত আছে, সেটাও তখনকার সিদ্ধান্তে। কিন্তু সময় পরিবর্তিত হয়েছে। আমরা একটা সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জাতির নতুন চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। সেই বিবেচনায় বিএনপি নতুন করে এ প্রস্তাবে একমত হয়েছে।’ তবে জেলার সদর উপজেলা এবং জেলা শহরের অতি কাছে যেসব উপজেলা রয়েছে, সেখানে অধস্তন আদালত প্রয়োজন হবে না। কোন কোন উপজেলায় অধস্তন আদালত প্রয়োজন, তার সংখ্যা নিরূপণের জন্য সমীক্ষার অনুরোধ করেন তিনি।
জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বিএনপি। তবে জরুরি অবস্থা চলাকালে মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এ ছাড়া জরুরি অবস্থাকে যেন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা না হয় সে ব্যাপারে বিএনপিসহ দলগুলো প্রস্তাব করে। বিএনপি মনে করে, এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী নির্বাচিত জাতীয় সংসদে হওয়া উচিত।
আলোচনায় কয়েকজন নেতা উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত স্থাপন করা হলে দুর্নীতি বাড়বে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাদের এমন বক্তব্যে দ্বিমত জানান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ।
তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত হলে দুর্নীতি বাড়বে, এটা ভুল ধারণা। জনসচেতনতা ও মূল্যবোধ বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।’
বিচারপ্রার্থীর হয়রানি রোধ করতে বিচারের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে। দুর্নীতির বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, দেশের ২৩টি জেলায় বর্তমানে ৪০টি চৌকি আদালত রয়েছে। এসব চৌকিকে স্থায়ী আদালতে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে এসব চৌকির অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহ করতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত স্থাপনে তাগিদ দেন। প্রয়োজনে সংসদীয় আসনের ভিত্তিতে দ্রুতই অধস্তন আদালত স্থাপনের প্রস্তাব করেন তিনি। এ ছাড়া কয়েকটি দলের পক্ষ থেকে আগামী কত বছরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণ করা হবে, তা নির্দিষ্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালতের সম্প্রসারণের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে সবগুলো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হবে না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কোনো কিছু দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে না। তারপরও যাতে করে কোনো রকম ভুল বোঝাবুঝি কিংবা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সে জন্য আমাদের দিক থেকে আন্তরিক চেষ্টা থাকছে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংশোধন করা হচ্ছে। গতকাল তারা উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে দলগুলো একমত হয়েছে। কিছু বিষয় এখনো আলোচিত হয়নি। কিন্তু সবাই চেষ্টা করছেন, এক জায়গায় আসার, ঐকমত্যে পৌঁছানোর। আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আলোচনা করে একমত হওয়ার চেষ্টা করছি।
বৈঠক শেষে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফায় পরবর্তী ১১তম বৈঠক বসবে আগামী বৃহস্পতিবার।