আবাসন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের পথ সুগম করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সদস্যরা বুধবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীতে নিজেদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এই তথ্য জানান।
‘ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগ: বিআইপি’র পর্যবেক্ষণ: শিরোনামে এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিআইপি সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান, ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহরিয়ার আমিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তামজিদুল ইসলাম, বোর্ড সদস্য আবু নাঈম সোহাগ ও ফাহিম আবেদীন।
সভায় বিআইপি সদস্যরা বলেন, ‘রাজউক ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) পুনরায় সংশোধন করার উদ্যোগ অনেকটা এগিয়ে নিয়েছে। এ সংশোধনীতে দেখা গেছে, আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে রাজউক রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় ভবন নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
বিআইপি সদস্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘আবাসন ব্যবসায়ীদের এই দাবি মানা হলে জনবহুল ঢাকা শহরে উঁচু ভবনের সংখ্যা বাড়বে এবং ইতোমধ্যে স্থবির হয়ে যাওয়া শহরে পরিবহন, পরিসেবাসহ সব ধরনের নাগরিক সেবার ওপর অসহনীয় চাপ পড়বে। এই চাপ বহন করার ক্ষমতা এই শহরের নেই। এই ধরনের উদ্যোগ কেন্দ্রীয় ঢাকার বাইরে অন্যান্য নগর এলাকার বাসযোগ্যতাকে একেবারে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে।’
এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব বিন্যাস, নগরজীবন রেখা, ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন, নাগরিক সুযোগ-সুবিধার মানদণ্ড প্রণয়ন, ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন ও উন্নয়ন সত্ত্ব বিনিময়- সবমিলিয়ে রাজধানী ঢাকার সমস্যাগুলো কমিয়ে পরিকল্পিত শহর গড়ার লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট। পরে রাজউকের এখতিয়ারভুক্ত এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য ঢাকা মহানগর এলাকায় ড্যাপের (২০১৬-২০৩৫) খসড়া ২০২০ সালে প্রকাশ করা হয়।
এরপর খসড়ার ওপর সুপারিশ ও আপত্তি দাখিল করার জন্য সবার কাছে আহ্বান জানানো হয়। পরে আপত্তি ও সুপারিশ বিবেচনা করে মহাপরিকল্পনাটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতি পাঁচ বছরে ড্যাপ নীতিমালা সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়।
বিআইপি সদস্যরা বলেন, ‘ড্যাপের এর সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ঢাকার অধিকাংশ এলাকার এফএআর মান ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’
সংশোধনীর খসড়া অনুযায়ী, খিলক্ষেত আবাসিক এলাকার এফএআর মান ২ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৪; মিরপুর ডিওএইচএস ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৮; বাড্ডা ২ থেকে ৩ দশমিক ৩; ফরিদাবাদ ২ থেকে ৩ দশমিক ১, রামপুরায় ২ থেকে ৩ দশমিক ৫, মিরপুর ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ৪ এবং বাসাবো-খিলগাঁও এলাকা ২ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৩ করবার প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।
বিআইপি সদস্যদের ভাষ্যে, এফএআর মান বাড়ানো হলে ওই এলাকার ট্রাফিক ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ড্যাপ সংশোধন করে ভবনে অতিরিক্ত তলা (ফ্লোর) নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলে রাজধানীতে পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস পরিষেবার ওপর চাপ পড়বে। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে ৩০ দফা প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়। এসব প্রস্তাবনায় বলা হয়, ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর অনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ত্রুটিপূর্ণ সংশোধন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। গুলশান-বনানী-ধানমন্ডির মত যে সব এলাকায় আবাসিক প্লটে উচ্চ এফএআর মান দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে কমিয়ে গ্রহণযোগ্য মানে আনতে হবে। আবাসিক এলাকার ভারসাম্য, আলো বাতাসের ন্যায্যতা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করতে এলাকাভিত্তিক উচ্চতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
জয়ন্ত সাহা/সুমন/