ইলিশের মূল্যবৃদ্ধির ১১ কারণ চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) বা ট্যারিফ কমিশন। ইলিশের আকার অনুযায়ী সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ারও সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় বাজারে ইলিশের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এমন সুপারিশ করেছে ট্যারিফ কমিশন।
ইলিশ মাছের দরদাম নিয়ে রবিবার প্রকাশিত ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইলিশের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা, মজুত ও সিন্ডিকেট, জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, মাছ ধরার খরচ বৃদ্ধি, নদীর নাব্য সংকট ও পরিবেশগত সমস্যা, অবৈধ জালের ব্যবহার, দাদন পদ্ধতিতে মাছ কেনা, বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকা, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও রপ্তানির চাপের কারণে ইলিশের দাম বাড়ে।
ইলিশের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে বাজারে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তার ভিত্তিতে ট্যারিফ কমিশন এই সমীক্ষা করেছে। চলতি সেপ্টেম্বরে ইলিশের কেজিপ্রতি দাম ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে জানিয়েছে ট্যারিফ কমিশন।
এ বিষয়ে ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল খান খবরের কাগজকে বলেন, ইলিশের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ট্যারিফ কমিশনের নজরে এসেছে। সব ধরনের খোঁজ খবর নিয়ে কমিশন থেকে একটি সমীক্ষা চালায়। এরপর ইলিশের দাম বাড়ার কারণ চিহ্নিত করা হয়।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিন কেজি গরুর মাংসের দামে এখন এক কেজি ইলিশ মাছ কিনতে হচ্ছে। একসময় এক কেজি গরুর মাংসের দামে তিন কেজি ইলিশ মাছ কেনা যেত। ইলিশ মাছের অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে। তাই খুচরা পর্যায়ে দাম ঠিক করে দেওয়া দরকার। এতে প্রান্তিক জেলেরা লোকসানে পড়বেন না।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইলিশ প্রায় শতভাগ দেশীয় পণ্য হলেও বাজারে এর দামের পেছনে কৃত্রিমতার সংযোগ রয়েছে। কেননা, এর আহরণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা ডলারের ওঠানামার তেমন প্রভাব নেই। সমীক্ষায় চিহ্নিত মূল জায়গা হলো আহরণ-পরবর্তী মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা স্তর ও তাদের অতিরিক্ত মুনাফা করা। মূলত দাদন ব্যবসায়ীদের কারসাজি ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে বেশি ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় বাজারের চেয়ে কম দামে রপ্তানি
ট্যারিফ কমিশন আরও বলেছে, স্থানীয় বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ইলিশ রপ্তানি হয়। সেপ্টেম্বরে স্থানীয় বাজারে এক কেজি ইলিশের দাম সর্বনিম্ন ৯০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দাম ২ হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে চলতি মাসে ভারতে রপ্তানি করা এক কেজি ইলিশের দাম পড়েছে গড়ে ১ হাজার ৫৩৪ টাকা। এ পর্যন্ত ৯৭ টনের বেশি ইলিশ ভারতে রপ্তানি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান রপ্তানি মূল্যে যদি ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে পারেন, তাহলে বুঝতে হবে স্থানীয় বাজারের মূল্যে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন মূল্যের (সংগৃহীত মূল্য) তুলনায় অস্বাভাবিক হারে মুনাফা করছেন।
স্থানীয় বাজারমূল্যের প্রবণতা
ট্যারিফ কমিশন ইলিশের স্থানীয় বাজারমূল্যের প্রবণতা দেখিয়েছে। ট্যারিফ কমিশন বলছে, গত চার মাসে ইলিশের দামের ঊর্ধ্বগতি বেশ লক্ষণীয়। গত জুনে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ছিল ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা। আগস্টে সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে দাম কিছুটা কমে হয় ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় উন্নীত হয়। অন্যদিকে গত পাঁচ বছরে স্থানীয় বাজারে ইলিশের দাম ৫৭ শতাংশ বেড়েছে বলে ট্যারিফ কমিশন বলছে।
এ ছাড়া গত চার বছরে রপ্তানি মূল্যও বেড়েছে। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতি কেজি ইলিশের রপ্তানি মূল্য ছিল ৯৪৭ টাকা। এ বছর তা ১ হাজার ৫৩৪ টাকায় উন্নীত হয়। প্রতি বছর গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টনের মতো ইলিশ আহরণ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছে।