বুধবার বেলা ২টা। রাজধানীর রূপনগর থানাধীন শিয়ালবাড়ীর সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে অন্তত আধা কিলোমিটার দূর থেকেই নাকে আসে ঝাঁঝালো উৎকট গন্ধ। কাছাকাছি গিয়ে দেখা যায়, আগুন লাগা সেই পোশাক কারখানা ও কেমিক্যালের গুদাম থেকে নিরাপদ দূরত্বে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ উপস্থিত সবাই অবস্থান করছেন। কেননা, তখনো ঘটনাস্থলটি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছিল। তখনো সেই পোশাক কারখানা ও কেমিক্যালের গুদাম থেকে প্রচণ্ড ধোঁয়া বের হচ্ছিল। এর মাঝে নিহত বা নিখোঁজদের জন্য সেখানে কয়েকজনকে আহাজারি করতে দেখা যায়।
আনোয়ার ফ্যাশন নামে পোশাক কারখানা এবং আলম ট্রেডার্স নামে কেমিক্যাল গুদামে মঙ্গলবারের ওই ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের করুণ মৃত্যুর পর রূপনগরের শিয়ালবাড়ী এলাকায় ছিল শোকের ছায়া। নিহতদের লাশগুলো ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের পর হস্তান্তর করা হবে তাদের স্বজনদের কাছে। এর মধ্যে গতকাল ছয়টি মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) শিয়ালবাড়ীতে আরও দেখা যায়, গলির মুখেই রাইজিং ফ্যাশন নামে একটি পোশাক কারখানার পাশে একটি ভবন এবং মসজিদের পাশেই আলম ট্রেডার্স নামে রাসায়নিকের একটি গুদাম। গুদামের বিপরীত পাশে দেখা গেছে ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্টস ভবনটি। তখনো গুদাম থেকে ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস বের হচ্ছিল। এতে শিয়ালবাড়ীর বাতাসেও একধরনের ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। রাসায়নিকের বিষাক্ত গ্যাসে পাশের রাইজিং ফ্যাশন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধার করে পাশের একটি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বেলা আড়াইটার দিকে দেখা যায়, কেমিক্যাল প্রোটেক্টর স্যুট পরা কয়েকজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী গলির ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন। তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলছিলেন, ‘ভেতরে এখনো প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং গ্যাস রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অপারেশনাল কাজ পরিচালনা করা মুশকিল স্যার। ঝুঁকি রয়েছে।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলেন, এখানে কেমিক্যালের বিষাক্ত ঝাঁঝ একটু বেশি। আমরা এখানে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু বিষাক্ত গ্যাস মিশ্রিত বাতাস শরীরে এসে লাগলেই জ্বালাপোড়া অনুভব হচ্ছে। আমরা দূরে দাঁড়িয়ে আছি, এর পরও শরীর ও ত্বক জ্বালাপোড়া করছে। এখানকার বাতাসও বিপজ্জনক।
শিয়ালবাড়ী এলাকায় স্বপ্ন জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান জানান, বুধবার সকালে একটি পোশাক কারখানার বেশ কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। তাদের কারও শ্বাসকষ্ট, কারোর কাশি হচ্ছিল। তাদের মধ্যে সাত থেকে আটজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। একজনের জ্ঞান ছিল না।
রূপনগরের শিয়ালবাড়ী আবাসিক এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কেমিক্যাল গুদাম ও পোশাক কারখানায় অপারেশনাল অভিযান চালানো অনিরাপদ বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ঢাকা) কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘বুধবার সকালে আমরা কেমিক্যাল প্রটেক্টর স্যুট পরে কেমিক্যাল গুদামের দরজা খুলেছি। ভেতরে ছিল প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং রাসায়নিকের বিষাক্ত গ্যাস। এই অবস্থায় অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করা অনিরাপদ। একটু সময় নিয়ে কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘বিষাক্ত এই গ্যাস মানুষের ত্বক, ফুসফুস ও হার্টে খুব দ্রুত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এ জন্য মাইকিং করে স্থানীয়দের বলছি, সবাই দূরে থাকুন, নিজেকে নিরাপদে রাখুন।’
গত মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে রূপনগরের শিয়ালবাড়ী আবাসিক এলাকায় গার্মেন্টস ও কেমিক্যাল গুদামে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। মরদেহগুলো ডিএনএ প্রোফাইল সংগ্রহের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার গার্মেন্টস অংশের আগুন নিয়ন্ত্রণ হয়। তবে পাশের আলম ট্রেডার্স কেমিক্যাল গুদামের আগুন গতকাল বেলা ২টা ২০ মিনিটে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
শিয়ালবাড়ী এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, শিয়ালবাড়ী সড়কের পশ্চিম পাসে আবাসিক এবং পূর্ব পাশে শিল্প এলাকা। এই এলাকায় বেশ কয়েকটি অবৈধভাবে কেমিক্যাল গুদাম রয়েছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে অনেক গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আগে অনেক আন্দোলন করা হলেও এই এলাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম সরানো সম্ভব হয়নি। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তারা একই জায়গায় থেকে যায়। থানা-পুলিশের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাশেম বলেন, ‘আবাসিক এলাকায় এসব কেমিক্যাল গুদাম আমাদের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই একটা ঘটনায় ১৬ জন মারা গেছেন। এই গুদামগুলো সরানো না হলে আমাদের আতঙ্ক থেকেই যাবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিয়ালবাড়ীর স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী খবরের কাগজকে বলেন, শিয়ালবাড়ীর ৩ নম্বর সড়কে আলম ট্রেডার্স কেমিক্যাল গুদামের মালিক মো. শাহ আলমের এই বেশ কয়েকটি কেমিক্যালের গুদাম রয়েছে। শিয়ালবাড়ী এলাকায় তার তিনটি গুদাম, বিরুলিয়ায় তার বড় কেমিক্যালের গুদাম। আগে শাহআলী থানার মিরপুর মাজার এলাকায় তার একটি কেমিক্যাল গুদামে আগুনের ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে হতাহত না হলেও সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার গুদামের ম্যানেজার মিন্টু ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া এই এলাকায় অবৈধভাবে অনেকেই কেমিক্যাল গুদাম স্থাপন করেছেন। কিন্তু এসব গুদামের কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা বা ফায়ার সেফটি কিংবা অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্টস ভবনের পাশের ভবনে এনআরএস ওয়াশ প্ল্যান্টের ওয়াশ ইনচার্জ মো. মিরাজ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিয়ালবাড়ী এলাকায় অনেক কেমিক্যাল গুদাম রয়েছে। ঘটনার দিন আগুন কেমিক্যাল গুদাম থেকে বিস্ফোরণ হয়ে গার্মেন্টস ভবনে এসে পড়ে। আমাদের ভবনের প্রায় সব শ্রমিক বের হতে পেরেছিলেন। মারা যাওয়া ১৬ জন শ্রমিক পাশের চারতলা ভবনে কাজ করতেন।’
ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইটেন্যান্স) লে. কর্নেল তাজুল ইসলাম বলেন, আলম ট্রেডার্স কেমিক্যাল গুদামের কোনো অনুমতি ছিল না। সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি তিনবার আগুন লাগা গুদামে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ওই গুদামটিতে অভিযান চালানোর পর্যায়ে ছিল।
বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে সমাজ কল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, সরকারকে তাৎক্ষণিক তদন্ত করতে হবে, যারা এটা করেছে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আমাদের স্ট্রং পলিসি থাকতে হবে, যেন জনবহুল এলাকায় এ ধরনের গুদাম না থাকে।’