জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত সুপারিশের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত হলেও সনদের আইনি নিশ্চয়তা বিধান ও রাজনৈতিক সমঝোতা- দুই ক্ষেত্রেই জটিলতা কাটাতে পারছে না জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এনসিপির শর্ত, বিএনপির আপত্তি এবং সংবিধান সংস্কারের আইনি কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় চূড়ান্ত সুপারিশ এখনো সরকারের কাছে জমা দিতে পারেনি কমিশন। ফলে সনদ বাস্তবায়নের ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট নিরসন করতে এখনো হিমশিম খাচ্ছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।
সনদ বাস্তবায়নের আইনি নিশ্চয়তা এবং সংবিধান সংস্কারের কাঠামো নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি কমিশন। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনো সনদে সই না করায় এবং গণভোটের প্রস্তাবে বিএনপির আপত্তির কারণে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রক্রিয়া থমকে গেছে।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ খবরের কাগজকে জানান, জুলাই সনদের বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত। এ পর্যায়ে ভুলত্রুটি সংশোধন ও আইনি জটিলতা নিরসন করতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে পর্যালোচনা অব্যাহত রেখেছেন তারা। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি দু-এক দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ সরকারকে দিতে পারব।’
এদিকে জুলাই সনদের আইনি স্বীকৃতি এবং শহিদ পরিবারের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্যরা।
রবিবার (২৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ এলাকার এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তারা বলেন, যেসব আদর্শ ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে তাদের সন্তানরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ পরিস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদের একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে শহিদদের আদর্শ ও অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়। একই সঙ্গে অবহেলা ও হয়রানি প্রতিরোধে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
রাজনৈতিক সমঝোতায় জট
জুলাই সনদে এখন পর্যন্ত ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট সই করলেও এনসিপি ও সিপিবির নেতৃত্বাধীন ছয়টি বাম দল এখনো সই করেনি। তাদের মধ্যে এনসিপি এ বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছে, সনদ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া তারা স্বাক্ষর করবে না। এ বিষয়ে কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমরা চাই সব দল সনদে সই করুক। কিন্তু নিশ্চয়তা প্রশ্নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আশা করছি এনসিপিও সনদে সই করবে।’ কমিশনও স্বীকার করছে- এই নিশ্চয়তা না থাকলে আরও কিছু দল আপত্তি তুলতে পারে। বিএনপি এখনো গণভোটের সময় নিয়ে দ্বিধান্বিত। তাদের দাবি, সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। এই অবস্থায় কমিশন রাজনৈতিক সমঝোতায় নতুন পথ খুঁজছে।
আইনি কাঠামো ও বাস্তবায়নের জটিলতা
জুলাই সনদের সংবিধানসংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো আগামী সংসদ বাস্তবায়ন করবে- এমন নিশ্চয়তা বিধান কীভাবে করা যায়, তা নিয়েই কমিশনের মূল চিন্তা। কমিশনের ভাবনা ছিল, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ-২০২৫’ জারি করে আগামী সংসদকে ৯ মাসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্নের নির্দেশ দেওয়া। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন না হলে কী হবে- এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
গত বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দুটি বিকল্প আলোচনায় আসে- ১. নির্ধারিত সময়ে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হলে সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ২. নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন না হলে প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত বলে গণ্য হবে।
কিন্তু দুই বিকল্পেরই রয়েছে বড় সীমাবদ্ধতা। প্রথম বিকল্পে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সংকট তৈরি হবে, কারণ সংসদ বিলুপ্ত হলে আবার নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্ন উঠবে- কার অধীনে হবে নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার না দলীয় সরকার? এতে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিকল্পটি আইনি দিক থেকে দুর্বল; কারণ সংসদীয় অনুমোদন ছাড়া কোনো সংস্কার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর করা সংবিধানসম্মত নয়।
কমিশনের পরিকল্পনায় গণভোট ও সংস্কার পরিষদ
ঐকমত্য কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে, ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করার পর একটি গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব রাখা হবে। গণভোটে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পরবর্তী সংসদ অনুমোদন করবে। সেই সংসদ নিয়মিত আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবে।
গতকাল সনদ বাস্তবায়নের উপায় ও পদ্ধতি সম্পর্কিত সুপারিশ নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের কার্যালয়ে বৈঠক করেন কমিশনের সদস্যরা। বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন বিশেষজ্ঞরা। বৈঠকে সনদ বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়, যেখানে সাংবিধানিক ও আইনি দিকগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত মতামতও পর্যালোচনা করা হয়। সনদ বাস্তবায়নে যাতে কোনো আইনি জটিলতার সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, সংস্কার প্রক্রিয়ায় আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সনদ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে।
বৈঠকের বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে সরকারের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ যাতে নেওয়া যায়, সেই বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। আজ সোমবার আবারও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসবে কমিশন। সুপারিশসংবলিত প্রস্তাব আজকালের মধ্যে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমরা চাই জুলাই সনদ শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ পাক। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য ও আইনি নিশ্চয়তা।’
কমিশন সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সুপারিশে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কমিশন সাংবিধানিক আদেশ ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ-২০২৫’ জারি এবং এরপর গণভোটের প্রস্তাব করা হয়েছে। গণভোটে গৃহীত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী জাতীয় সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা (সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও ত্রয়োদশ সংসদ) দিয়ে সনদের সংবিধানসম্পর্কিত বিষয়গুলো সংবিধানে যুক্ত করার সুপারিশ রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব পাসের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কারণ সংবিধান সংশোধনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাধ্যতামূলক। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায়, অর্থাৎ ১৫১ আসন পেলে প্রস্তাব অনুমোদন করতে পারবে- এমন সুপারিশের কথা আলোচনায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আজকের বৈঠকে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে আশা করা হচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩১ অক্টোবর। তার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন-সুপারিশ জমা দিতে চায় কমিশন, যেটি আইনি ও রাজনৈতিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হবে।