বাংলাদেশের প্রতিবন্ধীদের অধিকার বিষয়ে ‘প্রতিবন্ধী নাগরিক অধিকার সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম’ বিবৃতি দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ তার জন্মলগ্নে যে ঘোষণাপত্র তৈরি করেছিল তার তিনটি মূলনীতি হলো- সাম্য, ব্যক্তিমর্যাদা ও ন্যায়বিচার। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও একটি বৈষম্যহীন দেশ গঠনের স্বপ্নপূরণ হয়নি। ৭২-এর সংবিধানে অনেক কিছুর স্বীকৃতি দেওয়ার পরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দলিলে স্বাক্ষর দেশের সংখ্যালঘু প্রান্তিক মানুষের জন্য বিশেষ কার্যক্রম ও সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয় অনুচ্চারিতটি হলো জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ (ইউএনসিআরপিডি)। এই সনদ প্রণয়নে বাংলাদেশ অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। শুধু তাই নয়, পুরোনো ‘প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১’ বাতিল করে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ প্রণয়ন সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। তাই সমাজে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়ে এখন এক ইতিবাচক মনোভাব ধারণ করতে শুরু করেছে। তবে স্বীকার করতে হচ্ছে যে, এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে শিক্ষার বীজ আগেই বপন হওয়ায় তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, সম সুযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে ব্যক্তিস্বত্বা ও ব্যক্তি মর্যাদার দাবি করতে থাকে। বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকায় নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়ে প্রতিবন্ধী মানুষের মাঝে। উন্নত দেশগুলো একের পর এক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে থাকে প্রতিবন্ধী মানুষকে ঘিরে। এরই মাঝে হাজির হয় প্রতিবন্ধী মানুষের স্লোগান ‘প্রতিবন্ধী মানুষকে ছাড়া, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোনো কিছুই নয়’ (Nothing about us, without us) এই চ্যালেঞ্জের পথকে গতিশীলতা দান করে। নারীদের জন্য সিডও, শিশুদের জন্য সিআরসি গৃহীত হয় জাতিসংঘ থেকে। এমনকি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোনো লক্ষ্য স্থির না করেই। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবন্ধীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং দীর্ঘ ৪ বছরের প্রক্রিয়ার পর ২০০৬ সালে আলোর মুখ দেখে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (ইউএনসিআরপিডি)। এই ইউএনসিআরপিডি-এর মাধ্যমে সূচনা হয় অধিকার ভিত্তিক জীবরধারার কাল, যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষ নাগরিক ও ব্যক্তি হিসেবে সমসুযোগ ও সম-অধিকার উপভোগ করবে।
সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক দাতাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ইতিবাচক অংশগ্রহণ, বাণিজ্যিক সংস্থার অনুদান এবং সর্বোপরি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের অক্লান্ত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে পুরাতন জড়াকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলেছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এ সমাজেরই অংশ। উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদেরকে সমাজের মূলস্রোতে অন্তর্ভুক্ত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশে বর্তমানে সহস্রাধিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দীর্ঘদিন যাবৎ বেকার জীবনযাপন করছেন। তাদেরকে যথোপযুক্ত কর্মে নিয়োগ করার বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলে আজ পর্যন্ত সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। এই দাবিকে সামনে রেখে বিগত ১৯ অক্টোবর ২০২৫ হতে উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য চত্বরে অবস্থান করে ধারাবাহিকভাবে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতের নিমিত্তে তার যমুনা বাসভবনের দিকে গমনের চেষ্টা করে এবং পুলিশের নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, কয়েকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ৭৬টি সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমের রিসোর্স শিক্ষক এবং হাউজপ্যারেন্ট কাম শিক্ষকের প্রায় ১৪০টি পদ এবং ৫ বিভাগে পরিচালিত ৫টি সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে শিক্ষকের প্রায় ২০টি পদ শূন্য রয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবলের এ সব পদ শূন্য থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন প্রতিবন্ধী শিশুরা উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে এ সব শূন্য পদে দক্ষ জনবল নিয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বেকারত্বের কষাঘাতে নিষ্পেষিত হচ্ছে। এ কারণে যে সব পরিবারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে তারা তাদের সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতির আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আরও উল্লেখ্য যে, ২০১৯ সনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও ভাইবা পরিক্ষায় ৪ শতাধিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে চাকুরিতে নিয়োগ করা হয়নি। পরে চাকুরি প্রত্যাশীরা মামলা করেন। মামলার রায় তাদের পক্ষে আসা সন্ধে ও প্রতিবন্ধিতার কারণে তাদেরকে নিয়োগ না করে মামলার রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ সব কারণে পরিবারে যেমন প্রতিবন্ধী শিশুরা উপেক্ষিত ও অবহেলিত হচ্ছে, তেমনি উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে সমাজে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে।
যে দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষা আইন রয়েছে, যে দেশ জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ স্বাক্ষর করেছে, যে দেশে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করছে, যে দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের বিষয়টি রাষ্ট্রের একটি অগ্রাধিকার বিষয় হিসেবে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে উল্লেখ করা হয়। সে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার চাকুরি প্রত্যাশী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি এহেন অমানবিক আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তাই অনতিবিলম্বে প্রধান উপদেষ্টার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শূন্য পদগুলোতে উচ্চশিক্ষিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদের নিয়োগের মামলার আপিল প্রত্যাহার করে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী নাগরিকরা চূড়ান্ত হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য ধারাবাহিকভাবে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। বিগত সপ্তাহব্যাপী পুলিশি লাঠিচার্জ এবং বর্বরোচিত বাধা এই অমানবিক নীতির প্রমাণ।
প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার ধারাবাহিকভাবে দূর হয়ে আসছে।
সংগঠনটি বিবৃতিতে বলে, ‘ আমরা এ বিষয়ে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি এই কারণে যে, দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ওপর বলপ্রয়োগের নীতিতে পূর্বের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো মৌলিক তফাত খুঁজে পাচ্ছি না। দেশের বর্তমান সরকার প্রধান ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের নেতৃত্ব দানকারী সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আন্দোলনকারী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এ দেশেরই সন্তান। বিগত ১৭ বছরের বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জুলাই ৩৬ গঠিত হয়েছে এবং তার মধ্য দিয়েও হাজার হাজার যুবক প্রতিবন্ধী হয়েছে, তাদের প্রতি এই দমন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সামাজিক সাম্য ন্যায়বিচার মৌলিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সৃষ্টির লক্ষ্যে অগণিত যুবক তাদের জীবন উৎসর্গ করেছে এবং অগণিত মানুষ তাদের অঙ্গহানির কারণে প্রতিবন্ধীদের তালিকাভুক্ত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, এই তালিকায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের সন্তানরাও রয়েছে। নিজেদের সন্তানদের ওপরে দমন-পীড়ন বন্ধ করে আলোচনায় বসুন শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। বিগত এক বছরে সরকার প্রধান জনসাধারণের প্রয়োজনের ভিত্তিতে অগণিত নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, বহু জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন। অতএব, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমরা প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করি না।’
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন- অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন, অ্যাডভোকেট আল আমিন, সাইদুল হক চুন্নু, জাহাঙ্গীর আলম, আশিকুর রাহমান অমিত, নাসরিন জাহান, রোজিনা বেগম, রোকেয়া বেগম ও অ্যাডভোকেট মোসলেহ উদ্দিন প্রমুখ।
সুমন/