বাংলাদেশে প্রতি এক হাজারে শীর্ষ ১০ রোগের মধ্যে ৭৮ জন ভুগছেন হাই ব্লাডপ্রেসারে (উচ্চ রক্তচাপ)। সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা নেওয়া হয় ওষুধের দোকান বা ডিসপেনসারি থেকে, এদের সংখ্যা ৫১ শতাংশ। মশারোধে এখনো ৯৭ শতাংশ মানুষ মশারির ওপর নির্ভর করেন।
রবিবার (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হেল্থ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে (এইচএমএসএস)-২০২৫ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিবিএস ভবনের সম্মেলন কক্ষে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুজুর আলী। সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। সার্ভের প্রতিবেদনের তথ্যগুলো তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক মোস্তফা আশরাফুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলেয়া আক্তার বলেন, ‘জাতীয় উন্নয়নের জন্য সঠিক, সময়োপযোগী এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অপিহার্য। বিবিএসের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা অর্জনে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।’ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি বলেন, ‘এবারের সার্ভে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রাসঙ্গিক। কারণ এবারে দেশের সাম্প্রতিক রোগব্যাধির প্রবণতা, চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজননব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।’
প্রতিবেদনে মানুষের পরিবার এবং সামাজিক অবস্থার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দেশে পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা হচ্ছে ৪ দশমিক শূন্য ৩ জন। গ্রামে তাদের সংখ্যা বেশি, শহরে কম। ৯৮ শতাংশ পরিবারই বিদ্যুতের সঙ্গে সংযুক্ত। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডের আওতায় আছে সবচেয়ে বেশি পরিবার। ৯৩ শতাংশ পরিবারের পানির প্রধান উৎস হলো টিউবওয়েল। ৮৯ শতাংশ মানুষ নিজেদের বাড়িতে বসবাস করেন আর ভাড়াটিয়া মাত্র ৯ শতাংশ। পরিবারপ্রধানের ৮৩ শতাংশ পুরুষ এবং নারীপ্রধান পরিবারের সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ১৭ শতাংশ। প্রতি পরিবারে গড়ে শোবারঘরের আকার হচ্ছে ১৬২ বর্গফুট। গ্রামে পরিবারপ্রধান নারী হওয়ার হার শহরের তুলনায় বেশি।
স্বাস্থ্যসেবা ও রোগব্যাধি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার পরিবর্তে স্ব-উদ্যোগে বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সেবার ওপর মানুষ অনেক বেশি নির্ভরশীল। প্রতি হাজারে ৩৩২ জনের অসুস্থতা শনাক্ত হয়েছে। এই অসুস্থতার হার শহরের তুলনায় গ্রামে সামান্য বেশি। ডায়াবেটিসে প্রতি হাজারে ৪৩ জন আক্রান্ত আছেন। ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা এখন প্রতি হাজারে ১৫ দশমিক ৮৯ জন। সিটি করপোরেশন মশা মারতে নানা উদ্যোগ নিলেও মশা থেকে বাঁচতে এখনো ৯৭ শতাংশ মানুষ মশারির ওপর নির্ভর করেন। এরপর মশা প্রতিরোধে তারা ব্যবহার করেন রিফিলার। এই হার প্রতি ১০০ জনে ৭৩ জন। টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধৌত করেন মাত্র ৬৫ শতাংশ মানুষ। এই হার শহরে বেশি।
চিকিৎসা গ্রহণ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাতৃত্বকালীন সময়ে স্বাস্থ্যব্যয় এখনো অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। চিকিৎসা নিতে বছরে গড়ে জনপ্রতি খরচ ২ হাজার ৪৮৭ টাকা। শহরে এই ব্যয়ের হার আরও বেশি। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে যান মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেন প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ। সিজারিয়ান হারের ঊর্ধ্বগতি এখনো বেশি। প্রসব করা বাচ্চার ৪৯ শতাংশ এখনো সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম নেয়। সিজারে ব্যয় হয় গড়ে ২১ হাজার ৬৩০ টাকা। স্বাভাবিক বাচ্চা প্রসবের খরচ ৪ হাজার ৬৮৮ টাকা। মায়ের গর্ভকালীন সেবায় গড় ব্যয় হয় ৫ হাজার ৬৫৮ টাকা। বাচ্চা প্রসবের ২৪ শতাংশ হয় বাড়িতে। গ্রামে এই হার বেশি। প্রসবকালীন সেবায় ডাক্তারের উপস্থিতির হার ৬৭ শতাংশ। ১০ কিলোমিটার বা তার বেশি দূরত্বে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় প্রতি পাঁচজনে একজনকে। শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার জেলা হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করছে। গ্রামে প্রসব করানো স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর গ্রামের মানুষের নির্ভরতা শহরের তুলনায় দ্বিগুণ।
ধূমপান ও তামাক ব্যবহার
১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থাৎ চার ভাগের এক ভাগের বেশি মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। পুরুষের এই হার ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। নারীদের তামাক ব্যবহারের হার হচ্ছে সাড়ে ১৬ শতাংশ। মশারোধে শহরে ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহারের হার গ্রামের তুলনায় ছয় গুণ বেশি।