মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ প্রকল্পের মেয়াদ আরও তিন বছর বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে একইসঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় কমেছে প্রায় ৭৫৫ কোটি টাকা। এটি লাইন-৬ এর তৃতীয় সংশোধনী হিসেবে একনেক সভায় আলোচনা হয়েছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এর একজন কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মতিঝিল স্টেশনের জন্য অতিরিক্ত ৩.৫৬ হেক্টর জমি নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এতে ১ হাজার ১২১ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তরা উত্তর, উত্তরা মধ্য, আগারগাঁও ও মতিঝিল স্টেশনের চারটি স্টেশন প্লাজা নির্মাণ প্রকল্প বাদ দেওয়ায় ১৬৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। মূল লাইন ও স্টেশন নির্মাণ, ইলেকট্রিক ও মেকানিক্যাল (ইঅ্যান্ডএম) রেলওয়ে ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং পুনর্বাসন পরামর্শে আরও প্রায় ২১০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ শেষ করার প্রস্তাব এসেছে। মূলত মতিঝিল-কমলাপুর ১.১৬ কিলোমিটার সম্প্রসারণের কাজ শেষ করতে সময় বাড়ানোর প্রয়োজন। লাইন-৬ দেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প। ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ উত্তরা-মতিঝিল অংশ ইতোমধ্যে চালু রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উদ্বোধন করা হয়েছিল, ২০২৩ সালের শেষে মতিঝিল পর্যন্ত সব স্টেশন যাত্রীদের জন্য খোলা হয়।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, বেতন-ভাতা, পরামর্শক খরচ, স্টেশনারি, সম্মানি ও কম্পিউটার খরচ বেড়েছে। এছাড়া বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭০ কোটি টাকা। সংশোধনীর অনুমোদন পেলে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৩২ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।
এর আগে সোমবার সকালে রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেল ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এমআরটি লাইন-৬ এর মতিঝিল থেকে কমলাপুর বর্ধিত অংশের অগ্রগতি নিয়ে ডিএমটিসিএল এমডি মো. ফারুক আহমেদ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক এক সপ্তাহ কিছু ধীরগতি ছিল, তবে রিকভারি প্ল্যান কার্যকর করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে চলছে। সিস্টেম কন্ট্রাক্টরের অধিকাংশ উপকরণ এসে গেছে, কাজ শুরুর জন্য প্রস্তুত।’
মেট্রোরেলের অন্যান্য প্রকল্পের কী হালহকিকত
২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে মেট্রোরেল( ট্রায়াল রান) পরিচালনা করা হবে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী চলাচল করার লক্ষ্য রয়েছে।
এমআরটি লাইন-৬ এর দিয়াবাড়ি থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার সেকশনে কোনো অগ্রগতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই সেকশনে কাজ শুরু করার সম্ভাবনা নেই। এ খাতে বিনিয়োগের ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ এলেও গ্রহণযোগ্য বা নিশ্চিত প্রস্তাব নেই।
এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ ১২টি প্যাকেজে সম্পন্ন হবে। এই প্যাকেজগুলোতে কাজ পেতে বিভিন্ন বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও তারা প্রাক্কলিত দর থেকে অতিরিক্ত দাম হাকাচ্ছেন। এখন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ডিএমটিসিএল। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ঠিকাদারি প্যাকেজের দর অনেকটাই কমে আসবে।
এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ডিপো নির্মাণ ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এখন কিছু কারিগরি নিরীক্ষা চলছে, তবে আর্থিক নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পের কিছু ঠিকাদারি প্যাকেজে দরপত্র উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যমান যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইও সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু একনেকে অনুমোদন বাকি। অনুমোদন পেলে আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্যাকেজের দরপত্র উন্মুক্ত করা হবে। ডিএমটিসিএল এমডি জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে এই প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ দৃশ্যমান করতে চান তারা।
এমআরটি লাইন-৪ প্রকল্পে প্রাথমিক-সম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ১৭ ডিসেম্বর এই প্রকল্পের প্রকৌশলীরা চূড়ান্ত নকশা উপস্থাপন করবেন। এরপর বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হবে, ঠিকাদারি প্যাকেজ নির্ধারণ ও দরপত্র উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিএফসি) ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে ডিএমটিসিএলের।
এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে। এ অর্থ দিয়ে এই প্রকল্পের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করবে ডিএমটিসিএল। ছয় থেকে ৯ মাসব্যাপী এ প্রশিক্ষণে ১০০ জন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আসছে জানুয়ারি মাস থেকে মেট্রোরেল ভবনে শুরু হবে এই কর্মসূচি।
রাজস্ব বহির্ভূত আয় বাড়াতে চায় মেট্রোরেল
ডিএমটিসিএল এমডি ফারুক আহমেদ জানান, সোমবার (১ ডিসেম্বর) রাজস্ব বহির্ভূত আয় সংগ্রহ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। রাজস্ব বহির্ভূত আয় সংগ্রহ করতে ডিএমটিসিএল উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এগোতে চায়। তাদের লক্ষ্য, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা। ফারুক আহমেদ বলেন, রাজস্ব বহির্ভূত আয় সংগ্রহ করতে গিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ডিএমটিসিএল গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি দাম পেয়েছে। অনেক চাপ থাকা সত্ত্বেও আগের ঠিকাদারকে বহাল না রেখে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
ডিএমটিসিএল বিভিন্ন মেট্রোরেল স্টেশনের বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া দিতে আগ্রহী। ফারুক আহমেদ জানান, সব বাণিজ্যিক স্পেসে দোকান ভাড়া দিয়ে বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আয় হয়েছে। তবে কাউকে অনুরোধবিহীনভাবে বা নিয়মের বাইরে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি মেট্রোরেলে স্টেশনে।
মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর পাশে খালি জমি পড়ে আছে। জানুয়ারি মাস থেকে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় লিজ দেওয়া হবে এসব জমি। ডিএমটিসিএল চাইছে, শপিংমলের মতো বৃহৎ বাণিজ্যিক স্থাপনা হোক। তবে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে কৃষিজমি হিসেবেও বরাদ্দ দেওয়ার কথা পরিকল্পনা করছে তারা।
জয়ন্ত সাহা/সুমন/