২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অজ্ঞাত শহিদদের মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত আট জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে এ পর্যন্ত ১১৪টি অজ্ঞাত মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে রায়েরবাজার কবরস্থানে এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডিপ্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং আদালতের নির্দেশে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী ৯ পরিবারের দেওয়া নমুনার ভিত্তিতে আটজন শহিদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে।’
যাদের পরিচয় শনাক্ত হলো- ঢাকা মাদারটেকের শহিদ কাবিল হোসেন (৫৮), ঢাকার মোহাম্মদপুরের শহিদ সোহেল রানা (৩৮), শেরপুরের শহিদ আসাদুল্লাহ (৩১), ফেনীর শহিদ রফিকুল ইসলাম (২৯), ময়মনসিংহের শহিদ মাহিম (৩২), কুমিল্লার শহিদ ফয়সাল সরকার (২৬), পিরোজপুরের শহিদ রফিকুল ইসলাম (৫২) ও চাঁদপুরের শহিদ পারভেজ বেপারী (২৩)।
এর আগে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শহিদ বহু ব্যক্তির মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে শহিদ পরিবারের দাবি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই সংবেদনশীল কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পায় সিআইডি। কার্যক্রমটির নেতৃত্বে ছিলেন সিআইডিপ্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের (ইউএনএইচআরসি) সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডারের প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়।
এর আগে, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি মরিস টিডবল-বিনজ, যিনি বিচারবহির্ভূত ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ডবিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, তিনি বাংলাদেশে এসে সিআইডির ফরেনসিক, ডিএনএ ও মেডিকেল ফরেনসিক টিমকে দুই দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ দেন।
মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে মরদেহ উত্তোলন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, প্রোফাইলিং এবং পুনঃসমাধিস্থকরণ সম্পন্ন করা হয়েছে। এই প্রটোকল সম্ভাব্য বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর তদন্তে মানবাধিকার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা হিসেবে স্বীকৃত।
রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১৪টি মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
এই কার্যক্রমে সিআইডির পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে।
রায়েরবাজারে পরিচালিত এই বৃহৎ পরিসরের ফরেনসিক কার্যক্রম বাংলাদেশে মানবাধিকারভিত্তিক তদন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে শহিদ পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষিত হয়েছে।
শেখ জাহাঙ্গীর/এসজি/