নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ফরিদপুরের ৪ আসনে ততই নির্বাচনের উত্তাপ বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে বলা হয়েছে, জেলার ৪টি আসনের ১৫৪টি কেন্দ্র অতি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, ফরিদপুরের ৬৭টি কেন্দ্র অতি গুরুত্বপূর্ণ। এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো নিয়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে। তবে নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশ প্রশাসন কেউই এগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বলতে নারাজ। তারা বলছে, ভোটকেন্দ্রগুলো বিভিন্ন কারণে অতি গুরুত্বপূর্ণ, তবে ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, যেসব কেন্দ্রকে বিভিন্নভাবে নজরে রাখা হয়েছে সেগুলোর অবস্থান থানা থেকে অনেক দূরে, চরাঞ্চলে এদের অবস্থান। কেন্দ্রে যেতে যাতায়াত সমস্যা রয়েছে। সেসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎব্যবস্থা ভালো নয়। পারিপার্শ্বিকতার বিবেচনায় এসব ভোটকেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলায় ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৬৫৭টি। সদর উপজেলায় ১৫৪টি, বোয়ালমারীতে ৭৮টি, মধুখালীতে ৭৯টি, আলফাডাঙ্গায় ৪০টি, সালথায় ৫২টি, নগরকান্দায় ৬৫টি, ভাঙ্গায় ৯৯টি, সদরপুরে ৬৮টি ও চরভদ্রাসনে ২২টি কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে জেলা নির্বাচন অফিসের তালিকা অনুযায়ী অতি গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৬৭টি।
তবে জেলা পুলিশ বলছে, তারা ফরিদপুর জেলার ৬৫৭টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৫৪টি ভোটকেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্রের বিষয়ে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শামছুল আজম মোবাইল ফোনে খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুরের ৪ আসনে নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। অতি গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে। এসব ভোটকেন্দ্রকে বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হয়েছে। থানা থেকে ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব, চরাঞ্চল, যাতায়াত সমস্যা, বিদ্যুৎ না থাকা, পারিপার্শ্বিক ঝুঁকির বিষয়কে পুলিশ গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব কারণে ওই ভোটকেন্দ্রগুলোকে অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’
এ নিয়ে ফরিদপুরের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমেদ মোবাইল ফোনে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কেন্দ্র নেই। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা করে পুলিশ। তবে চারটি নির্বাচনি আসনের মধ্যে ৬৭টি ভোটকেন্দ্র অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চরাঞ্চলে রয়েছে ২৪টি ভোট কেন্দ্র। ওই কেন্দ্রগুলোর যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো নয়। কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ নেই। থানা থেকে তাদের অবস্থানও অনেক দূরে। এসব কারণে ওই কেন্দ্রগুলোকে অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।’
এদিকে ফরিদপুরের ৪টি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুটিতে ভোটার বেড়েছে, দুটিতে কমেছে। হিসাব মতে দুটি আসনে ভোটার ৯ হাজার ৯১৮ জন বাড়লেও বাকি দুটিতে কমেছে ২৯ হাজার ১৬৪ জন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুর-১ আসনে আগের চেয়ে নতুন ভোটার বেড়েছে ৫ হাজার ৯১৯ জন। ফরিদপুর-২ আসনে ভোটার কমেছে ৪ হাজার ৮৭৫ জন। ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে এবার ভোটার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কমেছে। এ আসনে ভোটার কমেছে ৩৪ হাজার ২০৭ জন। ফরিদপুর-৪ আসনে হালনাগাদে ভোটার বেড়েছে ৩ হাজার ৯৯৯ জন। সে অনুযায়ী খসড়া তালিকা থেকে হালনাগাদ তালিকায় ভোটার কমেছে ২৯ হাজার ১৬৪ জন।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ এ ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে। এর আগে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচি শুরু করা হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী জেলার চারটি নির্বাচনি আসনে বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ১৭ লাখ ৬৯ হাজার ৭৭৭ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৯ জন আর পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৯ লাখ ২ হাজার ৪২০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন ৮ জন।
এদিকে ২০২২ সালের আদমশুমারির তথ্যমতে, জেলার জনসংখ্যা ২১ লাখ ৬৫ হাজার ২৯০ জন। সর্বশেষ এই আদমশুমারি অনুযায়ী জেলায় নারীর সংখ্যা ১১ লাখ ১৪ হাজার ৯১৩ (যদিও সনদে লেখা আছে ১১ লাখ ১২ হাজার ৩৭৭ জন) আর পুরুষ ১০ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৭ জন।
ফরিদপুর-১
মধুখালী, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে আসনটি গঠিত। আয়তন ৬৩০ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার। এ আসনে মোট জনসংখ্যা ৬ লাখ ১৯ হাজার ৭৭৮ জন। হালনাগাদ ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ লাখ ১০ হাজার ৩৮০ জন। এর মধ্যে নারী ২ লাখ ৫০ হাজার ৯৩০ জন, পুরুষ ২ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪৯ জন আর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ১ জন। এবার এ আসনে নতুন ভোটার সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৯১৯ জন।
ফরিদপুর-২
নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর আয়তন ৩৭৮ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৪ লাখ ৯ হাজার ১৩৯ জন। এর মধ্যে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪১ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯০৯ ও নারী ১ লাখ ৬৯ হাজার ১৩২ জন। খসড়া ভোটার তালিকায় এ আসনে ভোটার কমেছে ৪ হাজার ৮৭৫ জন।
ফরিদপুর-৩
আসনটি ৪০৩ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে জনসংখ্যা ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৬২১ জন। হালনাগাদ ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩০ হাজার ৬২৭ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ৪১২ ও নারী ২ লাখ ১৫ হাজার ২১০ জন। খসড়া ভোটার তালিকায় এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৮৩৪ জন। এবার এ আসনে ভোটার কমেছে ৩৪ হাজার ২০৭ জন। এ আসনে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৫ জন।
ফরিদপুর-৪
ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনের আয়তন ৬৩১ দশমিক ২৪৯ বর্গকিলোমিটার। এখানে জনসংখ্যা ৫ লাখ ৬৬ হাজার ২৭১ জন। হালনাগাদ তালিকায় নতুনভাবে যুক্ত অনুযায়ী আলগী, হামিরদী ইউনিয়নসহ ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৭২৯ জন। খসড়া তালিকায় এ আসনে ভোটার ছিল ৪ লাখ ৯২ হাজার ৭৩০ জন। হালনাগাদে ৩ হাজার ৯৯৯ জন ভোটার বেড়েছে। এ আসনে মাত্র ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
এ বিষয়ে ফরিদপুরের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমেদ জানান, এবার দুটি সংসদীয় আসনে ভোটার বেড়েছে, দুটি আসনে ভোটার কমেছে। বেড়েছে নতুন অন্তর্ভুক্তির কারণে আর কমেছে স্থানান্তরের কারণে।