কয়েক দিন ধরে ঢাকা মহানগরে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্প চাপ বিরাজ করছে। এর ফলে রান্নাবান্না নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটছে রাজধানীবাসীর। গ্যাসের অভাবে হোটেল ও অফিসপাড়ায়ও চলছে চরম ভোগান্তি। বাইরে খাবার খেতে গিয়েও অনেকেই খেতে পারছেন না। আবার গ্যাসের সংকটে ঘুরছে না অনেক গাড়ির চাকা। এদিকে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তবে সরকার-নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ভোক্তারা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডার মধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। অন্যদিকে গ্যাসসংকটের কারণে বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলার দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন মানুষ।
এদিকে তুরাগ নদে ট্রলারের নোঙরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া গ্যাস পাইপলাইন মেরামত করা হয়েছে। তবে মেরামতের সময়ে পাইপে পানি প্রবেশ করায় এবং একই সঙ্গে ঢাকা শহরে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় ঢাকা মহানগরে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্প চাপ বিরাজ করছে। গতকাল শুক্রবার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ফেসবুক পেজে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, লাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে দু-এক দিন সময় লাগবে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজধানীর আমিনবাজার এলাকায় একটি মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে তুরাগ নদের তলদেশে স্থাপিত বিতরণ গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ঢাকা মহানগরে গ্যাসের চাপ মারাত্মকভাবে কমে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি মেরামতের সময় পাইপলাইনের ভেতরে পানি প্রবেশ করে। একই সঙ্গে শহরে গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ কম থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, সকালে সাধারণত চুলায় গ্যাস না থাকায় ফজরের নামাজের পরই সারা দিনের রান্না সেরে নিতে হয়। তবে তিন দিন ধরে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একেবারেই গ্যাস না থাকায় তাদের হোটেল থেকে সকালের নাস্তা কিনে খেতে হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. আবরার বলেন, ‘রাতে সামান্য গ্যাস থাকলেও আজ সারা দিন চুলায় গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হয়েছে।’
ধানমন্ডির বাসিন্দা মুরাদ হোসেন বলেন, ‘চুলায় গ্যাস নেই বললেই চলে। উপায় না পেয়ে ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করেছি।’
রাজধানীর আদাবর এলাকার বাসিন্দা সিয়াম রায়হান বাসায় এলপিজি ব্যবহার করেন। গত মঙ্গলবার দুপুরে তার বাসায় সিলিন্ডারে থাকা গ্যাস শেষ হয়ে যায়। এরপর দুই দিন মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কয়েকটি এলাকায় এলপিজির সিলিন্ডার খুঁজেও কিনতে পারেননি। পরে গতকাল সকালে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একটি দোকান থেকে বৈদ্যুতিক চুলা কেনেন তিনি।
সিয়াম রায়হান বলেন, ‘দুই দিন ধরে বাসায় কোনো রান্নাবান্না নেই। বাইরে থেকে খাবার এনে খাচ্ছি। এ জন্য আজ বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে এসেছি।’
মহাখালীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সজীব খান বলেন, ‘আমি দুপুরের খাবার অফিসে খাই। কিন্তু গ্যাসসংকটের কারণে আজ অফিসের ক্যানটিনেও রান্না হয়নি। বাইরে গিয়ে হোটেলে খাবারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। সিলিন্ডারসংকটে সেখানেও রান্না হয়নি। পরে রুটি ও কলা খেয়ে কাটিয়েছি।’
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বাজারে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড–এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। এর মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি। মোহাম্মদপুরের এইচআর ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, গ্যাস না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে এই চুলা কিনছেন। আবার অনেকে বিকল্প চুলা হিসেবে এটি ব্যবহার করেন। এমনিতে শীতের সময় বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা বেড়ে যায়।
খুলনায় সিলিন্ডারের তীব্র সংকট, বিপাকে গ্রাহকরা
খুলনায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি হঠাৎ করেই এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে অসন্তোষ বেড়েছে। এলপি গ্যাসের খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, খুলনায় ব্যবসায়ীরা কোনো ধর্মঘট করেননি। কোম্পানি থেকে গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে বিক্রেতাদের এ কথায় স্বস্তি ফেরেনি ভোক্তা পর্যায়ে।
খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার এলপি গ্যাস খুচরা বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম জানান, দুই মাস ধরে এলপি গ্যাসের সংকট চলছে। ডিলার পর্যায়ে থেকে খুচরা পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। আর এখন তো গ্যাসের সরবরাহ একদমই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ক্রেতারা দোকানে খালি সিলিন্ডার এনে গ্যাস নিতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন।
গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৩০০ টাকায় ডিলারদের কাছ থেকে কিনেছি। কিন্তু এখন ডিলার পর্যায়ে লোকজন বলছেন, ওই কোম্পানির গ্যাস নেই। অন্য কোম্পানির গ্যাস ১ হাজার ৫৫০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৫০ টাকা। এটি আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক কষ্টসাধ্য। এর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।’
দোকানে গ্যাস কিনতে আসা গ্রাহক ইদ্রিস হোসেন বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হুটহাট বৃদ্ধি করলে আমাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।’
এ বিষয়ে রূপসা, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটার ওমেরা কোম্পানির ডিলার সিফাত ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আরাফাত হোসেন বলেন, ‘সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাস ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হবে। অথচ আমাদের কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে সরকার-নির্ধারিত ওই রেটে। এরপর মোংলা বন্দর থেকে আমাদের এ পর্যন্ত পৌঁছাতে ২০ টাকা এবং লোড-আনলোডের জন্য ৬ টাকাসহ মোট ২৬ টাকা অতিরিক্ত খরচ রয়েছে। এরপর কর্মচারী, দোকান ভাড়া, খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গ্যাস পৌঁছে দেওয়াসহ আনুষঙ্গিক কমপক্ষে আরও ৩০ টাকা খরচ রয়েছে। এখন কীভাবে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব?
খুলনা এলপি গ্যাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহেদ আহমেদ বিটু জানিয়েছেন, খুলনায় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা কোনো ধর্মঘট করেননি বা রাজধানী ঢাকার ধর্মঘটের সঙ্গে একাত্মতাও ঘোষণা করেননি।
তিনি বলেন, মূলত দেশের প্রায় সব এলপি গ্যাস কোম্পানির গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক নানা জটিলতায় সময়মতো দেশের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস আমদানি করতে না পারায় এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।