বিগত ২০২৫ সালে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গত এক বছরে সারাদেশে ৭৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬,৪৭৬ জন আহত হয়েছেন।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এই বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৯৬২ জন নারী এবং ১০০৮ জন শিশু রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ৩০২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৬৭১ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩৬.২৯ শতাংশ। এ ছাড়া ১৫৬৪ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ২১.২৫ শতাংশ। একই সময়ে নৌ-দুর্ঘটনায় ১৪৯ জন এবং রেলপথ দুর্ঘটনায় ৪৭৮ জন নিহত হয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক ও সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ
দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা (২১৩৯টি) ও প্রাণহানি (২০১৮ জন) ঘটেছে। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ৪২০ জন নিহত হয়েছেন। সময়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে (২৮.৫০%) এবং রাতে (১৯.৫৫%)।
রাজধানীর সড়ক পরিস্থিতির চিত্র
রাজধানী ঢাকায় গত বছর ৪০৯টি দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানীতে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে বাইপাস রোড না থাকায় রাতে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং যানজটের কারণে চালকদের অসহিষ্ণু আচরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ি, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর সড়ককে দুর্ঘটনার 'হটস্পট' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক ক্ষতি ও মানবসম্পদ
ফাউন্ডেশনের হিসেব মতে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৫,৫৫০ কোটি টাকা। অপ্রকাশিত তথ্য বিবেচনায় নিলে এই ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১.৫ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য যে, নিহতদের ৭৭.৭৬ শতাংশই ছিলেন ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ।
দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ও সুপারিশ
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচলকে দায়ী করা হয়েছে।
নিরাপদ সড়কের জন্য সুপারিশ
বিআরটিএ ও বিআরটিসির কাঠামোগত সংস্কার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা। মোটরসাইকেলে আইওটি প্রযুক্তি এবং মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা। রাজধানীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু কর। সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহনকে একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই আসলে 'কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড'। যথাযথ প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।
জয়ন্ত সাহা/সুমন/