চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চলছে। ফলে বন্দর জেটিতে পণ্য ওঠানামা, ইয়ার্ড থেকে কার্গো ডেলিভারি, বন্দর দিয়ে জাহাজের আগমন ও বহির্গমনসহ সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বন্দর ভবন ঘুরে এই অচলাবস্থা দেখা গেছে।
বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা, শ্রমিক-কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, আমরা শ্রমিকদের অধিকার এবং বন্দরের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছি। সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত ইজারা প্রক্রিয়া থেকে সরে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কর্মবিরতি চলবে। বদলিসহ যত ধরনের বাধা আসুক, আমরা পিছপা হব না।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা আট ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেছিলাম। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে টানা চব্বিশ ঘণ্টার কর্মবিরতি চলছে। এর মধ্যে ঢাকায় আমাদের কর্মকর্তাদের আটকে রেখে জোর করে চুক্তিতে সই নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় কর্মসূচি শিথিল করার সুযোগ নেই। আমাদের কর্মবিরতি অনির্দিষ্টকাল চলবে।
গতকাল বুধবার সকালে বন্দর ভবন ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিক-কর্মচারীদের বিভিন্ন দপ্তরের দরজার ওপর সাদা কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা: ‘চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি চলছে।’ শ্রমিক-কর্চারীদের অফিস কক্ষ ছিল একেবারেই ফাঁকা। অফিস কক্ষের বাইরে মূল ফটক বন্ধ রয়েছে।
জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকে বন্দরের জেটি ও ইয়ার্ড ছিল জনশূন্য। মানুষ ও যানবাহনের কোনো চলাচল ছিল না। পাশাপাশি সব শেড ও অফিস ছিল বন্ধ। সকাল ১০টায় জোয়ারের সময় বন্দরের বহির্নোঙর থেকে আটটি জাহাজ জেটিতে ভেড়ার কথা ছিল। অন্যদিকে ছয়টি জাহাজ বন্দর ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোন জাহাজই চলাচল করতে পারেনি। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন জেটিতে অবস্থান নিয়ে টাগবোট, পাইলট বোট ও মুরিং বোটসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস নৌযান নোঙর করতে দেননি। শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ না দেওয়ায় বন্দর ইয়ার্ডের ডেলিভারি পয়েন্টগুলোও ছিল একেবারে ফাঁকা। আমদানি পণ্য ছাড়ও রপ্তানি চালান বন্ধ থাকায় বন্দর ইয়ার্ড এবং আইসিডিগুলোতে কনটেইনারের জট ক্রমেই বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার সংখ্যা বেড়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি বন্দর ইয়ার্ডে ৩২ হাজার ১১১ টিইইউএস কনটেইনার ছিল। বর্তমানে তা আরও বেড়ে ঠেকেছে ৩৭ হাজার ৩০৭ টিইইউএসে। অন্যদিকে বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারির হারও কমে গেছে। গত ৩১ জানুয়ারি বন্দর থেকে ৩ হাজার ১০২ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়। বর্তমানে ডেলিভারি আরও কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮৪ টিইইউএসে।
পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি ডিপোতেও আমদানি, রপ্তানি ও খালি কনটেইনারের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব মো. রুহুল আমিন শিকদার জানান, বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতি আগে ছিল আট ঘণ্টা। পরে সেটা চব্বিশ ঘণ্টা থেকে এখন অনির্দিষ্টকালে দাঁড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্দর ও দেশের ১৯টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) মধ্যে আমদানি, রপ্তানি কিংবা খালি কনটেইনার পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে আমাদের ইয়ার্ডগুলোতে কনটেইনার বাড়ছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এনসিটি রক্ষা আন্দোলনের গতি কমে আসে। গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দেয় হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালে চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিল করেন। এরপর থেকে দিনে দিনে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আট ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। পরে কর্মবিরতির সময়সীমা বাড়ানো হয়। গত ২ ফেব্রুয়ারি শ্রমিক নেতারা গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে মঙ্গলবার বেলা ৩টায় বন্দর ভবনের পাশে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে সমর্থন দিয়েছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)।