নির্বাচনে নারী ও তরুণ ভোটার–দুই শক্তির মিলিত অবস্থান নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। একদিকে নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে দৃঢ় নারী ভোটার; অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় সচেতন তরুণ প্রজন্ম। তাদের কণ্ঠে মিলেছে একটি অভিন্ন সুর, ভোট কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জবাবদিহির মাধ্যম।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ভোটারের সংখ্যা সাড়ে চার কোটির বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই অংশের সংগঠিত ও সচেতন অবস্থান নির্বাচনের ফলাফলের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নারী ভোটার: নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়ের প্রশ্ন
দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য ব্যয়–এই তিনটি বিষয় নারী ভোটারদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি। কুড়িগ্রামের এক চরাঞ্চলের নারী বলেন, ‘চাল-ডাল কিনতে কষ্ট হয়। ভোট দিলে যদি সংসার চালানো সহজ হয়, সেই ভোটই দেব।’
সংখ্যায় প্রায় সমান শক্তি হয়েও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারী ভোটারদের বড় অংশ এখনো নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ ও নানা ধরনের হুমকির মুখে। নির্বাচনের আগে কয়েকটি জেলায় নারী কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। প্রান্তিক অঞ্চলে ধর্মীয় ভাষ্য ব্যবহার করে ‘নির্দিষ্ট পছন্দে’ ভোট দেওয়ার চাপের কথাও শোনা গেছে।
রাজশাহীর এক পোশাককর্মী সুলতানা আক্তার বলেন, ‘ভোট দিতে যাব, কিন্তু ফেরার পথে নিরাপদ থাকব–এই নিশ্চয়তা কে দেবে? আমাদের ভোটের অধিকার আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই।’
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে সামাজিক প্রভাবশালীদের চাপ এখনো বড় বাধা। অনেক নারী খোলাখুলি মতপ্রকাশ করতে ভয় পান। নারী অধিকারকর্মীদের মতে, ফতোয়া বা সামাজিক চাপে ভোটের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া কেবল নির্বাচনি অনিয়ম নয়; এটি সংবিধানসম্মত অধিকারের লঙ্ঘন।
প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর নীতির দাবি
সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের কথা বারবার শুনি। কিন্তু রাস্তায় হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা–এসব তো বদলায়নি।’
নারী ভোটারদের বড় অংশের প্রত্যাশা স্পষ্ট। তাদের দাবি, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি ও নিরাপত্তা; স্বাস্থ্যসেবা ও মাতৃত্বকালীন সহায়তা বৃদ্ধি; রাজনৈতিক দলে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সরাসরি নির্বাচনে আরও বেশি নারী প্রার্থী।
প্রবীণ ভোটার আয়েশা খাতুনের ভাষায়, ‘নারীর কথা পুরুষরা বলবেন, এই সময় শেষ। আমাদের প্রতিনিধি আমরা নিজেরাই চাই।’
আসন্ন গণভোট নিয়ে নারী ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও সংশয় দুটিই রয়েছে। চট্টগ্রামের এক স্কুলশিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেন, ‘গণভোট মানে সচেতন সিদ্ধান্ত। ভয়ভীতি বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিলে সেটি জনগণের মতামত থাকবে না। নারীরা চাইছেন, গণভোটের আগে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রচার ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে প্রান্তিক ভোটাররা বিভ্রান্ত না হন।’
দিন বদলের স্বপ্ন তরুণদের, মনে সংশয়ের ছায়া
উত্তপ্ত নির্বাচনি পরিবেশে প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ। তাদের কাছে ভোট কেবল সাংবিধানিক অধিকার নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের দিকনির্দেশ নির্ধারণে সরাসরি অংশগ্রহণ।
ইসির তথ্য বলছে, গত এক বছরে ভোটার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৩৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭১১ জন। মোট ভোটারের মধ্যে সাড়ে চার কোটির বেশি ১৮-৩৫ বছর বয়সী।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, ‘প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছি, ভাবতেই শিহরণ লাগে। তবে চাই ভোটকেন্দ্রে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না ঘটুক। আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই।’ কিশোরগঞ্জের রাকিবুল ইসলাম, সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি খুঁজছেন। তার ভাষায়, ‘দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আমাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। তাই ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
নরসিংদী-৪ আসনের প্রযুক্তিবিদ সায়েম আহমেদ বলেন, ‘একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ দেশের জন্য জরুরি।’
প্রান্তিক জনপদের ক্ষোভ
খাগড়াছড়ির মিলন ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বহুবার শুনেছি। বাস্তবে তেমন পরিবর্তন আসেনি। এবার কথার বরখেলাপের জবাব ব্যালটে দিতে চাই।’ চুনারুঘাটের চা-বাগান এলাকার তরুণ নেতা লক্ষণ মুন্ডার অভিযোগ, ‘ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি আসে, সঙ্গে ভয়ভীতি। কিন্তু স্কুল নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, চিকিৎসা নেই। আমাদের প্রতিনিধি চাই, কিন্তু সেই সুযোগ কোথায়?’
গণভোট নিয়েও তরুণদের মধ্যে আলোচনা তীব্র। অনেকেই বলছেন, দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে চান। তবে অপতথ্য ও গুজবের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগও কম নয়।