গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তারা যে বাহিনীর পোশাকেই থাকুক না কেন, তারা অপরাধী–এ মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, অভ্যুত্থানকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে যারা হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলবে। তবে সেই সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে জনতার প্রতিরোধে যারা প্রাণ হারিয়েছে, সেটি অনেক ক্ষেত্রে ‘যুদ্ধের ময়দানে ফয়সালা হয়ে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সোমবার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের চতুর্থ দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বের আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
এ ছাড়া এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশে ‘মব কালচার’ আর বরদাশত করা হবে না। একই সঙ্গে দাবি আদায়ের নামে রাস্তাঘাট অবরোধ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা সংঘবদ্ধভাবে সহিংসতার ঘটনা ঘটালে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এ সময় পুলিশ বাহিনীকে সুশৃঙ্খল, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাকে তিনি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবেও উল্লেখ করেন।
পুলিশ হত্যার বিচার দাবি প্রসঙ্গে বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হানাদার বাহিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে যারা হত্যাকাণ্ড, ম্যাসাকার ও গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের অনেকেই জনতার প্রতিরোধের মুখে নিহত বা আহত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে, জুলাইযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এবং সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে যারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তারা যে বাহিনীর ড্রেসই পরুক, পুলিশ, অন্য কোনো বাহিনী বা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী–সবাই অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, আরও মামলা হবে এবং সব মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হবে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিচার প্রক্রিয়াকে স্বাধীন রাখা। এ ক্ষেত্রে আদালত স্বাধীনভাবে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। ইতোমধ্যে কিছু মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এবং কিছু মামলা সাধারণ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গুম, খুন, হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কিছু মামলার রায়ও ইতোমধ্যে ঘোষণা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্যে ‘জুলাইযোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছে, যা সংসদে বিল আকারে পাস করার বিষয়ে সর্বসম্মত মত হয়েছে।
সংসদে আলোচনায় পুলিশের ভূমিকা ও সংস্কার প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ বাহিনীকে সুশৃঙ্খল, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে এই বাহিনীকে সে ধরনের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করেন। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং তদন্ত কার্যক্রমকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যানবাহন ও সরঞ্জাম সংযোজনের কাজ চলমান রয়েছে।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সাম্প্রতিক সময়ের ‘মব কালচার’ নিয়ে সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি নিজেও গত ২১ ফেব্রুয়ারি এ ধরনের ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ কী, তা জানতে চান তিনি।
প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের সংস্কৃতি আর বরদাশত করা হবে না। দাবি আদায়ের নামে মহাসড়ক অবরোধ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা সৃষ্টির প্রবণতা সরকার আর অনুমোদন করবে না। জনগণের দাবি-দাওয়া থাকতেই পারে এবং তা জানানোর গণতান্ত্রিক অধিকারও রয়েছে। তবে সেই দাবি শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে জানাতে হবে। সড়ক অবরোধ করে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের প্রবণতা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিছু ঘটনা ‘মব কালচার’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো পরিকল্পিত অপরাধ হতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে পৃথকভাবে তদন্ত করে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কোনো ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না এবং একই সঙ্গে একটি আধুনিক, পেশাদার ও জনবান্ধব পুলিশব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
মামলা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে বিএনপির সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু রাজনৈতিক ও গায়েবি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কাজ হিসেবে কিছু মামলা প্রত্যাহার করে। সরকারি দল, বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা কিছু মামলা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যেসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, সেই মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য ওই কমিটির কাছে আবেদন করা যাবে। কমিটি বাছাই করে সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এরপর আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি যে পরামর্শ দেবে, সেই মতে সিআরপিসি ৪৯৪ অনুসারে মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।