গত দশ বছরে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৫ দশমিক ৭৬ মিলিয়নে পৌঁছেছে, যেখানে বাসের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ হলেও মোটরসাইকেলের হার দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০-৪১ সাল নাগাদ দেশে প্রাইভেট কারের সংখ্যা ৩৬ লাখ এবং মোটরসাইকেলের সংখ্যা দুই কোটিতে পৌঁছাবে, যা ভয়াবহ যানজট ও জ্বালানিসংকটের সৃষ্টি করবে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বাংলামটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারের বিআইপি কনফারেন্স হলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনাবিদরা এই শংকার কথা জানান।
বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে, যা পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিপিসির ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আমদানিকৃত জ্বালানির ৯৮ শতাংশই পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল এবং কেরোসিন। বর্তমানে বাংলাদেশের ১ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন পেট্রোলিয়াম সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৬৩ শতাংশই ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে।
পরিবেশগত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে জানানো হয় যে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের পর পরিবহন খাতই বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী, আর এই নিঃসরণের ৯১ শতাংশই আসে সড়ক পরিবহন থেকে।
৫০ বছরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেল ও নৌপথের অংশ আশঙ্কাজনকভাবে কমে সড়কপথের ওপর নির্ভরতা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে বিআইপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিতে বিআইপি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পেশ করেছে। তারা মোটরসাইকেলের বৃদ্ধি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, অবিলম্বে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু এবং ব্যাটারিচালিত বা ইলেকট্রিক বাস চালুর দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯০টি ওয়ার্ডে এক লাখ সাইকেল নিয়ে ‘সাইকেল শেয়ারিং’ প্রকল্প চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, কার ও মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশে কর বৃদ্ধি এবং সেই অর্থ দিয়ে ‘জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড’ গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনাবিদরা আরও প্রস্তাব করেন যে, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন যাতায়াত দাপ্তরিকভাবে বাসভিত্তিক করা উচিত এবং ব্যক্তিগত গাড়ির কারখানার বদলে দেশে ইলেকট্রিক বাসের কারখানা স্থাপনে নীতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
সম্মেলনে বিআইপির যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেনসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন ।
জয়ন্ত সাহা/রিফাত/