গ্রীষ্মের শুরুতে প্রচণ্ড দাবদাহের পরে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশজুড়ে রাতের তাপমাত্রা কমে এসেছে। এখন অনুভূত হচ্ছে হালকা শীত। ভ্যাপসা গরমের পর এমন আবহাওয়ায় জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বিরাজমান লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এতে দেশজুড়ে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। আগামী বুধবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত চলবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান রবিউল আওয়াল বলেন, ‘মেঘের ঘন স্তরের কারণে সূর্যের তাপ যেমন প্রবেশ করতে পারে না, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি ভূপৃষ্ঠের তাপ শুষে নেয়। এর ফলে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এ সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বা রিলেটিভ হিউমিডিটি ৯০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর ফলে চারপাশ স্যাঁতসেঁতে অনুভূত হয়। বৃষ্টির সঙ্গে মৃদু বা মাঝারি ঠাণ্ডা বাতাস শীতের আমেজকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
আমাদের দিনাজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে দিনাজপুরে রোদ ও বৃষ্টির পালাবদলে তীব্র গরম অনুভূত হলেও রাতে বইছে স্বস্তির হালকা বাতাস। দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, গত সাত দিনে জেলায় মোট ১৭৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা তাপমাত্রা কমাতে ভূমিকা রাখছে। গতকাল জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জুর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে তীব্র গরম থেকে মুক্তি মিললেও দিনের বেলা আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি এখনো কাটেনি।’
আমাদের পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির পরে গতকাল রোদ ঝলমলে সকাল দেখেছেন জেলাবাসী। গতকাল সকাল ৯টায় জেলার তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে জেলা শহরের বাইরে অনেকে আমাদের প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পর বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়ায় তারা ভারী কাপড় পরছেন।
টানা তিন দিনের কালবৈশাখী ও বৃষ্টির প্রভাবে ঠাকুরগাঁও জেলায় হঠাৎ করেই শীতের অনুভূতি ফিরে এসেছে। বৈশাখ মাস চললেও সন্ধ্যার পর থেকেই তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাচ্ছে, আর রাত যত গভীর হচ্ছে ততই বাড়ছে শীতের তীব্রতা। আমাদের ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, অনেকেই কিছুটা মোটা কাপড় ও কম্বল ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শীতের প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বৈশাখ মাসেও এমন ঠাণ্ডা পড়বে ভাবিনি। রাতে ফ্যান বন্ধ করে ঘুমাতে হচ্ছে, এমনকি পাতলা কম্বলও নিতে হচ্ছে।’
ঠাকুরগাঁও আবহাওয়ার অফিসের কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা হওয়ায় এখানে এমনিতেই শীতের প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। আর বর্তমানের বৃষ্টি ও ঝড়ের প্রভাব কেটে গেলে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। তবে আগামী কয়েক দিন রাতের বেলায় শীতের এই অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে।’
তবে কৃষকদের জন্য এই আবহাওয়া কিছুটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা।
গতকাল দেশের সর্বোচ্চ ১৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। গতকাল দিনাজপুরে ৫৮ মিলিমিটার, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৬১ মিলিমিটার, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৫৭ মিলিমিটার, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৪৫ মিলিমিটার ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
গতকাল দেশের সর্বোচ্চ ৩৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে। তবে সেখানেও ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। খুলনা বিভাগে কোথাও বৃষ্টিপাত না হলেও তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ছিল।
ভারী বর্ষণের পর ফের শুরু হবে তাপপ্রবাহ
আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন মূলত সূর্যরশ্মি এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আকাশের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রায় উল্লেখযোগ্য তারতম্য ঘটছে। একে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ‘রেডিয়েটিভ ফোর্সিং’ বলা হয়।
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা খবরের কাগজকে বলেন, যখন আকাশ মেঘমুক্ত বা পরিষ্কার থাকে, তখন সূর্যের ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি কোনো বাধা ছাড়াই সরাসরি ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে। মেঘের অনুপস্থিতিতে ভূপৃষ্ঠ এই তাপের বেশির ভাগ শোষণ করে নেয়, যার ফলে তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মেঘ না থাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায় না, বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে ‘অ্যালবেডো প্রভাব’ বলা হয়। এতে ভূমিসংলগ্ন বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মেঘলা দিনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। মেঘের উপরিভাগ সূর্যের তাপকে মহাকাশে প্রতিফলিত করে পাঠিয়ে দেয়, ফলে ভূপৃষ্ঠে তাপ পৌঁছাতে পারে না। একে ‘ক্লাউড অ্যালবেডো ফোর্সিং’ বলা হয়। দিনের বেলা ঘন মেঘের আস্তরণ থাকলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সরাসরি বাড়তে পারে না, যা পরিবেশকে তুলনামূলক শীতল রাখে।
তাপমাত্রার এই তারতম্য সব জায়গায় একরকম হয় না। ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত কারণে এতে ভিন্নতা দেখা দেয়।
কাজী জেবুন্নেছা জানান, আগামী বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমতে শুরু করবে। ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়বে। আগামী ১০ মের পর থেকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ধারণা করছি, আগামী ১৫ মের পর থেকে সারা দেশের তাপমাত্রা বাড়বে। সে সময়ে তাপপ্রবাহ বইতে শুরু করবে।’