গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার অধিকারকর্মীদের অভিজ্ঞতা থেকে মানবিক বিপর্যয়ের এক অবর্ণনীয় ও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অবরুদ্ধ গাজার জনগণের জন্য ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার এই শান্তিপূর্ণ মানবিক মিশনকে ইসরায়েলি বাহিনী নৃশংসভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। অভিযানে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকরা এমনভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, যা মধ্যযুগীয় বর্বরতার কল্পনাকেও ছাপিয়ে যায়। আল-জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং মানবিকতার নীতির এক নির্লজ্জ লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত বুধ থেকে শুক্রবারের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী ফ্লোটিলা নৌবহর থেকে প্রায় ৪৫০ জন অধিকারকর্মীকে আটক করেছে। এই কর্মীরা যে ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, তা শুনলে যেকোনো সভ্য মানুষের বিবেক কাঁপে। মুক্তি পাওয়ার পর অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের হাঁটুতে ভর দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। অনিয়মিত ও নির্বিচারে মারধর করা হয়েছে। কয়েক দিন ধরে তারা কোনো খাবার পাননি। একাধিক ক্ষেত্রে, আটক কর্মীদের ওপর কুকুর লেলিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো, তাদের শৌচাগারের দূষিত পানি পান করতে বাধ্য করা হয়।
ইতালীয় অধিকারকর্মী চেজারে তোফানি রোমে ফিরে জানান, তাদের সঙ্গে ভয়ংকর ও অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। প্রথমে সেনাদের হেফাজতে রাখা হয়, পরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যেখানে তারা ক্রমাগত হয়রানি এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ইতালির ইসলামিক কমিউনিটিজ ইউনিয়নের সভাপতি ইয়াসিন লাফরাম বলেন, ‘তাদের ওপর অস্ত্র তাক করা হয়েছে এবং যে রাষ্ট্র নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে, সেখানে এমন আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ইতালীয় সাংবাদিক সাভেরিও তোমাসি জানান, ইসরায়েলি সেনারা আটক অধিকারকর্মীদের ওষুধ দেননি এবং তাদের সঙ্গে ‘বানরের মতো আচরণ’ করেছেন। প্রহরীরা তাদের নিয়ে বিদ্রূপ ও হাসাহাসি করছিলেন। আটক কর্মীদের মধ্যে ছিলেন বিশ্বখ্যাত জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি মান্ডলা ম্যান্ডেলা এবং কয়েকজন ইউরোপীয় আইনপ্রণেতা।
অন্য ইতালীয় সাংবাদিক লরেনজো ডি’আগোস্তিনো অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং অর্থ চুরি করেছেন। তিনি বলেন, আটককালে কুকুর লেলানো হয়েছে এবং বন্দুকের লেজার লাইট ব্যবহার করে তাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
পাওলো ডি মোনটিস নামের এক অধিকারকর্মী জানিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তারক্ষীদের দিকে তাকানো নিষিদ্ধ ছিল, সবসময় মাথা নত রাখতে হতো। তাকালে, সেনারা আঘাত হানে; কখনো গায়ে ধাক্কা, কখনো মাথার পেছনে থাপ্পড়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়।
মালয়েশিয়ার অভিনেত্রী ও গায়িকা হাজওয়ানি হেলমি ইস্তাম্বুলে পৌঁছে বলেন, ‘কল্পনা করতে পারেন, আমরা শৌচাগার থেকে পানি খেতে বাধ্য হয়েছি? কেউ কেউ খুব অসুস্থ ছিল, কিন্তু তারা বলেনি তাতে কোনো দুঃখ বা সহানুভূতি নেই।’ তার বোন হেলিজা জানান, ১ অক্টোবর খাবার খাওয়ার পর তিন দিন কিছুই খাননি- শুধু শৌচাগারের পানি পান করেছেন।
গ্রেটা থুনবার্গকেও নির্যাতনের শিকার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, তাকে মাটিতে টেনে নেওয়া হয়েছে, ইসরায়েলি পতাকায় চুমু খেতে বাধ্য করা হয়েছে এবং মিথ্যা প্রচারণার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং চরম ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের পক্ষ থেকে বিরোধপূর্ণ মন্তব্য এসেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে, খারাপ আচরণের অভিযোগ মিথ্যা এবং বন্দিদের সব আইনি অধিকার রক্ষা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বেন-গভির কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে কঠোর আচরণ নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি গর্বিত যে আমরা ফ্লোটিলা কর্মীদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সমর্থকদের মতো আচরণ করেছি। যারা সন্ত্রাসকে সমর্থন করে, তারা সন্ত্রাসী এবং তাদের সন্ত্রাসীদের মতো আচরণই প্রাপ্য।’ তিনি আরও যোগ করেন, যারা ভেবেছিল তারা লাল কার্পেট বা সংবর্ধনা পাবে, তারা ভুল করেছেন।
ইসরায়েলে আটক অধিকারকর্মীদের ওপর চালানো এ নির্যাতনের জন্য পাকিস্তান, তুরস্ক, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তীব্র সমালোচনা করেছে। বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ হয়েছে এবং গ্রিস লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার এ মানবিক মিশনের অংশগ্রহণকারীরা শুধু গাজার অবরুদ্ধ জনগণের কাছে প্রতীকী ত্রাণ পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের মহৎ উদ্যোগের বিনিময়ে তারা পেয়েছেন অমানবিক নির্যাতন। যেখানে সারা বিশ্ব গাজার গণহত্যা বন্ধে আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে এ নিরস্ত্র মানবিক অভিযানের বিরুদ্ধে চালানো নৃশংসতা মানবতার প্রতি এক কলঙ্কজনক অপরাধ। ইতিহাস একদিন ইসরায়েল এবং তার সহায়ক রাষ্ট্রগুলোকে এর জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে। আজ মানবতা সত্যিই বিপন্ন।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার এ মানবিক মিশনের অংশগ্রহণকারীরা শুধু গাজার অবরুদ্ধ জনগণের কাছে প্রতীকী ত্রাণ এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিখাদ মানবিক- যুদ্ধ, অবরোধ ও রাজনৈতিক স্বার্থের ছায়ার মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষদের সাহায্য করা। কিন্তু এই মহৎ উদ্যোগের বিনিময়ে তারা পেয়েছেন এমন অমানবিক নির্যাতন, যা মানবতার মৌলিক নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং শাস্তির অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
এটি শুধু একটি পৃথক ঘটনা নয়; এটি মানবিক নীতির বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের সাম্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করে। যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজার গণহত্যা এবং অবরুদ্ধ জনগণের মানবাধিকার রক্ষা করতে আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে নিরস্ত্র মানবিক অভিযানের বিরুদ্ধে চালানো এ নৃশংসতা মানবতার প্রতি এক কলঙ্কজনক আঘাত। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতার খেলা কখনো কখনো সবচেয়ে অসহায় মানুষের ওপর নিষ্ঠুর আঘাত চালাতে পারে।
ইতিহাস একদিন অবশ্যই বিচার করবে। ইসরায়েল এবং তার সমর্থক রাষ্ট্রগুলোকে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। শুধু ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য নির্যাতন চালানো কখনো মানবিকতা ও ন্যায়ের স্থায়ী মূল্যকে বিলীন করতে পারবে না। এ ঘটনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- মানবাধিকার রক্ষা, শান্তিপূর্ণ সহায়তা নিশ্চিত করা এবং নিরীহ মানুষের ওপর জুলুম প্রতিহত করা।
আজ মানবতা সত্যিই বিপন্ন। কিন্তু এই বিপন্নতার মধ্যেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সবার দায়িত্ব- শব্দ, কাজ এবং নৈতিক সচেতনতার মাধ্যমে এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। গাজার মানুষদের জন্য যে প্রতীকী সহায়তা পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তা শুধুই ত্রাণ নয়; এটি মানবিক নৈতিকতার এক প্রতীক, যা প্রতিটি জাতি, সরকার এবং ব্যক্তি সম্মান করতে বাধ্য।
সর্বশেষে বলা যায়, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার এ মানবিক অভিযান শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গল্প নয়; এটি পুরো বিশ্বকে মানবতার প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দেওয়া একটি নাটকীয় এবং মর্মস্পর্শী ঘটনা। ইতিহাস, ন্যায় এবং মানবিক নীতির অঙ্গীকারের কাছে এ নির্যাতন একদিন অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হবে।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



