২য় পর্ব
প্রতিষ্ঠার দুই বছর পূর্ণ করে তৃতীয় বর্ষে পা দিচ্ছে দৈনিক খবরের কাগজ। জাতীয় এ দৈনিকটি অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা সময়ে ছাপা পত্রিকা প্রকাশ কতটা চ্যালেঞ্জের, হাজারও সংবাদপত্রের ভিড়ে কেন আরেকটি নতুন কাগজ নিয়ে এলেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। সেসব গল্প শুনতেই খবরের কাগজের হেড অব ডিজিটাল গোলাম রাব্বানী মুখোমুখি হয়েছিলেন খবরের কাগজের সম্পাদক ও প্রকাশক মোস্তফা কামালের।
তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, এই জায়গাটায় কাজ করার সুযোগ আছে, বিপণনের আধুনিকায়ন হলে সংবাদপত্রই উপকৃত হবে? এবং পাঠকও উপকৃত হবে।
মোস্তফা কামাল : হ্যাঁ, পাঠক তো চায় পত্রিকা পড়তে। কিন্তু তার হাতের কাছে পত্রিকা পায় না। এখন তো মানুষ পুরো পৃথিবীটাকে একটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হিসেবে দেখে। সে সারা বিশ্বের খবর পড়তে চায়। আপনি দেখেন যে, গ্রামের ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তার দিন দিন স্বপ্ন কিন্তু বড় হয়, সে দেশের সীমানা পার হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। এ স্বপ্নবাজরা তো গ্রামে বসেই দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো পড়তে চায়। তারা তো সে সুযোগটা পায় না। এখন মোবাইলের কারণে হয়েছে কী সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভুল জিনিস ছড়িয়ে পড়ে। যার যা খুশি ছেড়ে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এগুলো দেখে হয়তো মানুষ বিনোদন পায়, কিন্তু যদি তার হাতে আমরা পত্রিকাটা পৌঁছাতে পারতাম, সে সত্যটা জানতে পারত। তখন সে ভুল জিনিসে সময় দেবে না।
বিপণন নিয়ে আপনার কথা শুনলাম আমরা। এখন একটু জানতে চাই পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগ নিয়ে। যেকোনো ছাপা কাগজের মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে তার বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিং বিভাগ। বিজ্ঞাপনকে সংবাদপত্রের ভাষায় লক্ষ্মীও বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের ও সেবার প্রচার প্রচারণার জন্য ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল অ্যাডসেন্স, টিকটকের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে দেশের বিজ্ঞাপন বাজারও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে গণমাধ্যম টিকে থাকাই তো এখন বড় চ্যালেঞ্জ? এ থেকে উত্তরণের কোনো পথ আছে কি?
মোস্তফা কামাল: খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রসঙ্গ। এটা আসলে শুরু হয়েছে করোনার সময় থেকে। ওই সময় তো অনেক পত্রিকাই বন্ধ হয়ে গেল। আমি তখন কালের কণ্ঠে, তখন আমরা দেখলাম পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপন আমরা পেতাম তা অর্ধেকে নেমে এল। ফলে আয়ের ওপর একটা বিশাল চাপ পড়ল আমাদের। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। এই মুহূর্তে আমি বলব যে, করোনা থেকে শুরু করে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকরা। অনেক সাংবাদিক বেকার হয়েছেন। তাদের পরিবার দুর্বিষহ জীবন যাপন করেছে। সেই কঠিন সময়টায় আমরা দেখেছি যে, একটা প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানও ভেঙে গেছে। কোনো কোনো সম্পাদক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তো বিজ্ঞাপনের চ্যালেঞ্জটা এখনো আছে এবং গণমাধ্যম সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে।
এই সময় কি পার হবে না?
মোস্তফা কামাল: আমরা আশা করছি একটি ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে এ খারাপ সময় কেটে যাবে। আর ফেসবুক বা গুগলে বিজ্ঞাপন চলে যাওয়ার যে বিষয়টা বললেন, আমি বলব কোম্পানি তো সব সময় চাইবে তার প্রোডাক্টের সর্বোচ্চ প্রচার যেখানে পাবে সেখানেই অ্যাড দিতে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোর জন্য মাল্টিমিডিয়াও একটি বড় আয়ের জায়গা হতে পারে। আমরাও এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। একজন বিজ্ঞাপনদাতা যখন দেখবেন যে, তার একটি বিজ্ঞাপন একই সঙ্গে প্রিন্টে যাচ্ছে, অনলাইন এবং ভিজ্যুয়ালেও প্রকাশ হচ্ছে; তখন তো তিনি এটার ফিডব্যাক ভালো পাবেন। এ জায়গাগুলো নিয়ে তখন মার্কেটিং টিম কাজ করতে পারে। আসলে সমস্যা হয়েছে এখন দক্ষ মার্কেটিংয়ের লোকও পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ডিজিটাল মার্কেটিং। এ কঠিন সময়কে উত্তরণ করাই তো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা একটা নতুন পত্রিকা, গত দুই বছরে আমাদের আহামরি ফ্যান ফলোয়ার তৈরি না হলেও আমরা মানুষের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে আস্তা তৈরি করতে পেরেছি। আর পণ্যের প্রচার সবাই চায় একটি বিশ্বাসযোগ্য প্লাটফর্ম থেকেই করতে।
বিপণন ও মার্কেটিংয়ের অনেক খবর তো জানা হলো, আমি একটু জানতে চাই খবরের কাগজ প্রকাশের পর পরই দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে গণ-অভ্যুত্থান, পুরোটা সময় মোকাবিলা করা তো একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আপনার জন্য। আপনি এ চ্যালেঞ্জটা কীভাবে সামাল দিয়েছেন।
মোস্তফা কামাল: একটা রেজিম চেঞ্জ আন্দোলন হবে এটা অনেকেই তখন বুঝতে পারেনি। কোটা নিয়ে ছাত্রদের একটা আন্দোলন যেটা আবার শাহবাগ টিএসসিকেন্দ্রিক আন্দোলন, সবাই তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু খবরের কাগজ শুরু থেকেই এ আন্দোলনের আচটা টের পাচ্ছিল। আমরা তখন গুরুত্বের সঙ্গে আন্দোলনের খবরগুলো প্রকাশ করছিলাম। আমাদেরও প্রশ্ন ছিল স্বাধীনতার এত বছর পর চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০ ভাগ কোটা কেন থাকবে? ২০১৮ সালে কিন্তু এ ইস্যুটার মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল। এটাকে আদালতে আটকে দেওয়া হলো। আমাদের দেশে অনেকেই আদালতের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কিন্তু আদালতের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলে, প্রশ্ন তোলে। আমরা যদি সমালোচনা না করতে পারি, না কথা বলতে পারি, যে এই সিদ্ধান্তটা আবার পুনর্বিবেচনা করা দরকার। মিডিয়া তো বলতেই পারে। সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটা গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদপত্রকে আমরা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলি। যদি কিছুই না লিখতে পারি, যদি একটা রায়ের সমালোচনা না করতে পারি, তাহলে তো এই যে চতুর্থ স্তম্ভ বিষয়টাই তো একটা বেজলেস কথা হয়ে যায়। সেই জায়গা থেকে আমরা আন্দোলনটা কাভার করেছি। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে, আন্দোলনটা অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। কারণ সরকার একের পর এক ভুল করে যাচ্ছিল। সেই ভুলগুলোও কিন্তু আমরা পত্রিকায় একের পর এক প্রকাশ করেছি। যেহেতু ছাত্র আন্দোলন, সেখানে আমরা দেখেছি যে, এই আন্দোলনে অভিভাবকরা যুক্ত হয়েছে। আমরা তাদের কথাও বলেছি। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের এখানে এসেছে, আমরা তাদেরও বলেছি আন্দোলনটা কিন্তু ভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছে। তারাও আমাদের কথাগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সরকার এটাকে গুরুত্ব দেয়নি। বিদেশি সংস্থাগুলোও সরকারকে জানিয়েছিল যে, এটা কিন্তু স্বাভাবিক আন্দোলন না। দ্রুত সেটেল করা ভালো। আমাদের পত্রিকার কলাম, নিউজগুলোয় সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের কলামিস্ট আবুল কাসেম ফজলুল হকের সেই সময়কার কলামগুলো যদি কেউ পড়ে থাকেন, তিনি কিন্তু স্পষ্ট করে বলেছেন এই আন্দোলনের পেছনে আমেরিকা যুক্ত হয়েছে। বড় একটা শক্তি কাজ করছে। তার পরও সরকার এক ধরনের গেম খেলেছে এ আন্দোলন নিয়ে। সেগুলো আমরা প্রকাশ করেছি। পত্রিকার কাজই আসলে এটা। আগের সরকারের সময় তাদের বিরুদ্ধে কিছু লেখা যেত না বল হতো, আমরা কিন্তু তাদের অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখেছি। দেখুন ছাত্রদের দাবি তারা ঠিকই মেনেছিল কিন্তু ততদিনে অনেক ছাত্র শহিদ হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সরকার আসলে নিজের ফাঁদেই নিজে পা দিয়েছে।
আপনি শুরু থেকেই নানান প্রসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার কথা বলছিলেন। আসলে সোশ্যাল মিডিয়া এখন সংবাদপত্র জগতের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সংবাদমাধ্যমগুলো এখন ডিজিটাল প্লাটফর্মের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে লড়াই করে সংবাদমাধ্যম কীভাবে টিকে থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
মোস্তফা কামাল: আমি কিছুটা অতীতে যাই, আমি কালের কণ্ঠ ছাড়ার পর আমার বন্ধুবান্ধবরা বলেছিলেন, আপনি তো সম্পাদক হয়েছেন, সাংবাদিকতায় আর তো কিছু হওয়ার নেই। এখন আপনি লেখালেখিতে মন দেন। পত্রিকা আর করার দরকার নেই। পত্রিকা আর মার্কেট পাবে না। করোনার ওই সময়টায় ঘরে ঘরে অনলাইন হয়ে গিয়েছিল এবং ফেক নিউজের ছড়াছড়ি ছিল চারদিকে। যে যেভাবে পেরেছে একটা ডোমেন নিয়ে অনলাইন শুরু করে দিয়েছে। মানুষ এক ধরনের পাগল হয়ে যাওয়ার দশা। সেই রকম একটা পরিস্থিতিতে মনে হলো বস্তুনিষ্ঠ কিছু করা যায় কি না। তখনই আমার কিছু বন্ধুর সাপোর্ট নিয়ে আমি শুরু করেছিলাম ঢাকা প্রকাশ। সেখানে আমাদের স্লোগান ছিল সততাই শক্তি, সুসাংবাদিকতায় মুক্তি, তো এই যে স্লোগান, এটা মানুষ বিশ্বাস করেছিল। আমরাও চেষ্টা করেছিলাম যে, কোনো ভুল সংবাদ প্রকাশ করব না এবং প্রকাশের পর যেন কোনো সংবাদ প্রত্যাহারও করতে না হয়। যদি আমি কোনো সংবাদ প্রত্যাহার না করি, তাহলে সবাই সজাগ থাকবে, ভুল নিউজ দেবে না। সেই সময় ঢাকা প্রকাশ দ্রুত মার্কেট পায়। সেই ধারাবাহিকতায় খবরের কাগজ সৃষ্টি। খবরের কাগজেও আমরা সততা, নিষ্ঠা এবং পেশাদারত্ব বজায় রেখেছি। মানুষ আসলে কী চায়, সাংবাদিকরাই সত্য প্রকাশ করবে, সাংবাদিকরাই সাহসী কথা বলবে, এবং সাংবাদিকরাই নিরপেক্ষ থাকবে। তার কোনো দল থাকবে না, আপনি হয়তো মনে মনে একটা দলকে ভালোবাসতে পারেন, বা একটা দলকে নিশ্চয়ই আপনি ভোট দেন, কিন্তু আপনার পেশায় তার কোনো প্রভাব থাকবে না। হ্যাঁ, আমি একটা দলকে ভোট দিই, কিন্তু আমি আমার পেশায় পবিত্র থাকছি কি না, পেশাকে কলুষিত করছি কি না। অথবা আমি পেশার সঙ্গে বেইমানি করছি কি না, সেটা দেখতে হবে। আমার মূল লক্ষই ছিল পেশাকে কলুষিত না করা, সত্যের পক্ষে থাকা। যে কারণে পাঠক আমাদের আস্থার জায়গায় রেখেছে।
মিস ইনফরমেশন ডিল করাও এখন সংবাদপত্রের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সবাইকে, ফেক নিউজ নিয়ন্ত্রণের জন্য কী কী পদক্ষেপ গণমাধ্যমগুলোর নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মোস্তফা কামাল: সারা বিশ্বের মানুষ এখন অনলাইনেই সব খবর পড়ে ফেলছে, দেখে ফেলছে, যার হাতে এখন স্মার্টফোন তার হাতে এখন সারা দুনিয়া।
সত্য প্রকাশ আপনি ঢেকে রাখতে পারবেন না। সরকারকে হানিমুন পিরিয়ড দিই, সেটা আর দেওয়া যাবে না। নতুন সরকার এলেই তাকে হানিমুন পিরিয়ড দিলাম, বা তার প্রথম ১০০ দিনকে সেক্রিফাইস করলাম, তার ভুলভ্রান্তি লুকিয়ে রাখলাম। এগুলো করা যাবে না। ভুল তো ভুলই, এটাকে লুকানো যাবে না। দুর্নীতি তো দুর্নীতিই। সরকার যদি ক্ষমতায় এসে প্রথমেই একটা দুর্নীতি করে তাহলে কী আপনি চোখ বন্ধ করে রাখবেন। সরকারকে সঠিক পথে রাখার দায়িত্ব কিন্তু গণমাধ্যমের। আমি প্রথমে যদি তার ভুলটা না ধরে দিই তাহলে পরে সে আরেকটা ভুল করবে। আজকে আমরা যে দুর্নীতির কথা বলি, গত ১৫ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে, বিদেশে পাচার হয়েছে, আমরা যদি শুরু থেকেই এগুলোর বিরুদ্ধে লিখতে পারতাম, তাহলে এতটা দুর্নীতি হতো না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দিকে যেতে হবে। নতুন যারা ক্ষমতায় আসবে আগামীতে তারা যদি শুরুতেই তাদের মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব দেয়, দুই বছর পর সাংবাদিকরাই খুঁজে বের করবে কার কার সম্পদ বাড়ল এবং সেটা কী প্রক্রিয়ায় বেড়েছে। সত্য প্রকাশ যতই কঠিন হোক সেটা প্রকাশ করতে হবে। সত্য যদি সাহসের সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমগুলো প্রকাশ না করতে পারে তাহলে তারা সোশ্যাল মিডিয়ার কাছে হেরে যাবে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় সব খবর চলে আসে। আপনি কয়জনের অ্যাকাউন্ট ব্লক করবেন, সত্য তো আপনার সামনে আসবেই। সোশ্যাল মিডিয়া এখন এতটাই শক্তিশালী যে, আপনি তাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। তোয়াজ না করে তোষামদ না করে সংবাদ মাধ্যম যদি সত্য প্রকাশ না করতে পারে তাহলে সোশ্যাল মিডিয়ার কাছে হারিয়ে যাবে সংবাদমাধ্যম। এটাই এখন সংবাদপত্রের বড় চ্যালেঞ্জ।
কামাল ভাই আপনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কথা বলছিলেন, অনেকেই বলে বাংলাদেশে এখন প্রেস রিলিজ সাংবাদিকতা চলছে। আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কমে গেছে?
মোস্তফা কামাল : হ্যাঁ, তা তো কমেছেই। অনেকটাই কমেছে। আমরাও অনুসন্ধানী রিপোর্টার খুঁজি কিন্তু পাই না। ছয় মাস এক বছর ধরেও একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি হয়। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম তখন সুযোগ হয়েছিল দেশটির একাধিক পত্রিকা অফিস ভিজিট করার। সেখানকার প্রভাবশালী পত্রিকা লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস যেটাকে এলএ টাইমস বলা হয়। পত্রিকাটির এডিটরের সঙ্গে অনুসন্ধানী রিপোর্টিং নিয়ে আলাপের সময় তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন, তাদের একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করতে এক বছর সময় লেগেছিল, যেটা নিয়ে তারা পরে ৭টি সিরিজ প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেই প্রতিবেদনগুলো এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, ওই সিরিজগুলো নিয়ে আলাদা সাপ্লিমেন্ট প্রকাশ করতে হয়। টনক নড়িয়ে দিয়েছিল পুরো আমেরিকার। এই প্রতিবেদন তৈরি করতে তাদের বিভিন্ন দেশে যেতে হয়েছিল এবং প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়েছিল। তো আমাদের দেশেও তো এরকম হতে পারে। সেটা আমরা পারছি না। এটার পেছনে যে বিনিয়োগ দরকার সেটা আমরা করতে পারি না। রিপোর্টারদের আগ্রহ এবং ধৈর্যও নেই। আমার মনে হয় সামনের দিনের সাংবাদিকতাই হবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। পুরো পত্রিকায় যদি একটিও অনুসন্ধানী রিপোর্ট থাকে তাহলে সেটাই পাঠক পড়বে। গতানুগতিক পত্রিকা দিয়ে এই মার্কেট ধরে রাখা যাবে না। আমরা অনেক কঠিন জিনিস দেখি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। তখন সোশ্যাল মিডিয়ার চাপের কারণে পত্রিকাগুলো বাধ্য হয় নিউজ করার। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায়ই নির্ধারণ করে সরকার থাকবে, না থাকবে না। আমাদের দেশেও যদি দেখেন ’২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা বিশাল ভূমিকা ছিল। কিছুদিন আগে নেপালে যে সরকার পরিবর্তন হলো সেখানেও সোশ্যাল মিডিয়ার একটা ভূমিকা ছিল।
কামাল ভাই এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করে, যার মধ্যে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনও একটি। আপনার কি মনে হয় এ কমিশন দিয়ে সাংবাদিকদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হবে?
মোস্তফা কামাল: আমার তো মনে হয় না। কারণ কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। তারা একটি ভালো রিপোর্ট দিয়েছে সরকারকে। যেমন ধরেন টিভি এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো ওয়েজবোর্ড নেই। পত্রিকাগুলোয় আছে তাও সেটা নামমাত্র। সব মিডিয়া ওয়েজবোর্ড সাপোর্টও করে না। সরকারি যে সাপোর্ট দরকার সেটাও আমরা পাই না। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারও কিন্তু পত্রিকাকে সাপোর্ট দেয়, বিশেষ করে বিজ্ঞাপনে। আমাদের এখানে সরকার যদি মনে করে এটা আমার পক্ষের পত্রিকা তাহলে সেখানে বেশি করে সরকারি বিজ্ঞাপন দেয়, আর যদি মনে করে আমার পক্ষের না, তাহলে সেখানে বিজ্ঞাপন দেয় না। নিউজ প্রিন্টের কোনো সুবিধা নেই। নিউজপ্রিন্ট যারা আমদানি করে সরকার যদি তাদের টেরিফ ফ্রি করে দেয় তাহলে দেশের মার্কেটে কম দামে নিউজপ্রিন্ট পাওয়া যায়। তাহলে পত্রিকার উৎপাদন খরচ কমে যায়। কিন্তু সে জায়গাটায় সরকারের কোনো সাপোর্ট নেই। আমরা আশা করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকার এ জায়গাটি নিয়ে কাজ করবে। কারণ গণমাধ্যম ঠিক না হলে কিন্তু এ দেশের গণতন্ত্রও ঠিক হবে না। এ গণতন্ত্রেরও আমরা ফ্যাসিবাদী রূপ হিসেবে দেখব। গণতন্ত্র আমরা চাই, কিন্তু মিডিয়াকে শক্তিশালী রূপে দেখতে চাই না, তাহলে তো হবে না। মুখে আমরা অনেক কথাই বলি, কিন্তু সাংবাদিকরা যদি ভালো না থাকে তার পরিবার যদি ভালো না থাকে সে তো ভালো কাজটা দিতে পারবে না। সেই শৃঙ্খলাটা তো আসতে হবে। এখন যে সংবাদ মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে আসে, তাকে আগে ভাবতে হয় যে, কত বছর লস দিয়ে প্রতিষ্ঠানটা চালাতে হবে। সেখানে সরকার যদি কিছুটা সাপোর্ট দেয় তাহলে লসের পরিমাণটা কমে আসে। এ সরকারের সুযোগ ছিল কিছু করার, সেটা আমরা হারিয়েছি। এখন ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে চাওয়া থাকবে তারা যদি সত্যিকারের গণতন্ত্র চায় তাহলে তারা শক্তিশালী গণমাধ্যম চাইবে। বিজ্ঞাপনে মনোপলি করবে না। নিউজপ্রিন্ট আমদানির ক্ষেত্রে যে মনোপলি সেটা তারা করবে না। এমন অনেকেই আছেন যারা সরকারি সুবিধার অপব্যবহার করে থাকেন। সেগুলো বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে যারা পেশাদার হাউস, পেশাদার সাংবাদিক তাদের সাপোর্ট দিতে হবে, টিকিয়ে রাখতে হবে সরকারকে। এই জায়গাটা তৈরি না হলে আমাদের দুর্ভোগ-দুর্গতি থাকবেই।
আপনার সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার দীর্ঘ বছরের, সংবাদ দিয়ে শুরু করেছিলেন। এরপর প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, ঢাকা প্রকাশ হয়ে বর্তমানে খবরের কাগজ। তো আপনার কাছে কী মনে হয় বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী?
মোস্তফা কামাল: আমার ৩৬ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ভালো কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। ’৯১ সালের পর থেকে আমি পেশাদার সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি। তখনকার সময়টা আসলে ভালো ছিল। ওই যে লোকে বলে না, যায় দিন ভালো। আগে সবকটি পত্রিকা হাউসে ওয়েজবোর্ড দিত, সবার মধ্যে পেশাদার একটা মনোভাব ছিল। সেই জায়গা থেকে আমরা অনেকটা পিছিয়ে গেছি। মনে হয়েছে আমার প্রোটেকশন দরকার, তাই আমি একটা পত্রিকা খুলে ফেললাম, কিন্তু আমি চিন্তা করিনি এখানে যারা কাজ করবেন তাদের কতটা সুযোগ-সুবিধা দিতে পারব, বা এটাকে একটা পেশাদার হাউস হিসেবে গড়ে তুলতে পারব কি না। সেই জায়গাটা থেকে মুক্ত থেকে আমরা তো এখন টিকে থাকার লড়াই করছি। আমরা একটা পেশাদার হাউস করলাম কিন্তু এখন টিকে থাকতে পারছি না, সহযোগিতার পরিবর্তে অসহযোগিতা পাচ্ছি। আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলাম যে, বৈষম্য দূর হবে। কিন্তু এখন কী দেখছি- বৈষম্য আরও বাড়ছে। আমরা দেখলাম যে, সারা দেশে মব সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে, আমরা দেখলাম যে, এ দেশের যে ইতিহাস-ঐতিহ্য সেগুলোকে ভূলণ্ঠিত করা হলো। পীর-আউলিয়াদের এই দেশে আমরা দেখলাম তাদের মাজারগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। সমাজে সহমর্মিতার জায়গা নেই। আমি আমার বাবা-মাকে যেভাবে পা ছুঁয়ে সালাম করতাম, শিক্ষকদেরও সেভাবে সালাম করতাম। সেই জিনিসগুলো এখন আর নেই। আমরা এখন দেখি যে, বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করাচ্ছে ছাত্ররা। শিক্ষকদের অপমান করছে। এই শিক্ষার্থীরাও তো একটা সময় পেশায় যাবে, হয়তো কেউ শিক্ষক হবে, কেউ অন্য পেশায় যাবে, তখন তাদের কী অবস্থা হবে? এই জায়গাটা আমরা ঠিক করতে পারিনি। আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি করছি, পারস্পরিক যে শ্রদ্ধাবোধ সেটা আমাদের মধ্যে নেই। আমরা একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা ভাবতে পারি না। একটা বড় গ্রুপকে ছাড়াই আমরা চিন্তা করছি আমরা কীভাবে নির্বাচনে যাব। জিতে আসব এবং ক্ষমতায় যাব। তাহলে তো আর ইনক্লুসিভ সোসাইটি হলো না। আমি খুব শঙ্কিত, কারণ একটা বিভাজিত সমাজ আমাদের সামনে। মব সন্ত্রাসের চেয়েও কঠিন একটা ভায়োলেন্স অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। দেশের অসংখ্য তরুণ বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে, অসংখ্য পরিবারও একই চেষ্টা করছে। কেন সে মাতৃভূমি ছেড়ে যাবে। সে তো একটা অড জব করার জন্য যাবে না। কিন্তু সেই চিন্তাটা তারা করছে। এ দেশকে তারা নিরাপদ আবাস ভূমি মনে করছে না। এই নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কাদের? যারা রাজনীতি করে তাদের। আজকে একটা বড় রাজনৈতিক দল অপেক্ষায় আছে ক্ষমতায় যাবে, কিন্তু সে কেন ভাবছে না যে, তারা আরেকটা বড় দলকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এক বছর পরই তো তারা আরও বেশি শক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়াবে। তখন তো দেশে আরও বেশি সামাজিক ক্লেশ তৈরি হবে। এগুলো ভেবে আমি আরও বেশি শঙ্কিত গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
ধন্যবাদ কামাল ভাই। আমরা আশা করতে চাই আপনার এই শঙ্কা কেটে যাবে। সুন্দর সময় আসবে। শেষ করার আগে জানতে চাই- খবরের কাগজের পাঠকের উদ্দেশ্যে যদি কিছু বলেন?
মোস্তফা কামাল: গত দুই বছরে খবরের কাগজ পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে, ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে এবং সুধী সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক সবাই সহযোগিতা করেছেন। দেশ-বিদেশের পাঠক আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন, সাহস দিচ্ছেন। আমাদের পাঠকরাই আমাদের শক্তি, আমাদের পেশাদারত্বই আমাদের শক্তি। যত সংকট আসুক, যত বাধা আসুক সব বাধা মোকাবিলা করেই আমরা পাঠকের সামনে হাজির হবে। আমরাও আশা করছি, পাঠক আমাদের সঙ্গেই থাকবেন, তাদের ভালোবাসা পাব আমরা।
আরও পড়ুন:
প্রথম পর্ব: বিশেষ সাক্ষাৎকার: মোস্তফা কামাল আমরা নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রকাশ করছি
.jpg)
.jpg)
.jpg)