দীর্ঘ ছয় বছরব্যাপী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাস্তবতায় ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘের জন্ম হয়। বিশ্ব শান্তি ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ আজ তার ৮০তম বার্ষিকীতে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। সংস্থাটির নিজস্ব একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য- প্রতি বছর হাজার হাজার প্রতিবেদন তৈরি করে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এর অধিকাংশই কেউ পড়ে না। এ অভিযোগ শুধু বহিরাগতদের নয়, বরং জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস নিজেই স্বীকার করেছেন এ অদক্ষতার কথা।
প্রতিবেদনের পাহাড় পাঠকের অনুপস্থিতি
জাতিসংঘের ‘ইউএন ৮০’ সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সংস্থাটি বছরে ১,১০০টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে- যা ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২৭ হাজার বৈঠকের আয়োজন। কিন্তু এই বিপুল কর্মযজ্ঞের ফলাফল হতাশাজনক। মাত্র ৫ শতাংশ প্রতিবেদন ৫,৫০০ বারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে, যা সর্বোচ্চ সংখ্যা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি পাঁচটি প্রতিবেদনের একটি ১ হাজার বারেরও কম ডাউনলোড হয়েছে। গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ‘ডাউনলোড মানেই যে তা পড়া হয়েছে- এমনটা কিন্তু নয়।’ এ মন্তব্য প্রকৃত পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে। যদি ডাউনলোডের সংখ্যাই এত কম হয়, তাহলে প্রকৃত পাঠকের সংখ্যা আরও হতাশাজনক হতে বাধ্য।
অর্থনৈতিক অপচয়ের মাত্রা
জাতিসংঘের ২৪০টি সংস্থার এ বিপুল কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে বিশাল আর্থিক ব্যয়। প্রতিটি প্রতিবেদন তৈরিতে জড়িত থাকে গবেষক, বিশেষজ্ঞ, অনুবাদক, সম্পাদক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। বৈঠকগুলোতে থাকে ভ্রমণ খরচ, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, অনুবাদসেবা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার খরচ। যখন এ বিপুল বিনিয়োগের ফলাফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না, তখন তা শুধু অর্থের অপচয় নয়, বরং মানবতার সেবায় নিয়োজিত একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষতি। বিগত সাত বছর ধরে জাতিসংঘ আর্থিক সংকটে রয়েছে। ১৯৩টি সদস্য দেশের অনেকেই নির্ধারিত চাঁদা সময়মতো বা পুরোপুরি পরিশোধ করে না। এমন পরিস্থিতিতে সম্পদের অপচয় আরও বেশি অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। যে অর্থ দিয়ে অপঠিত প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে, তা দিয়ে প্রকৃত মানবিক সেবায় অংশ নেওয়া যেত।
কার্যকারিতার সংকট
জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলো অপঠিত থাকার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, এ প্রতিবেদনগুলো প্রায়ই অত্যধিক প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় লেখা হয়, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। দ্বিতীয়ত, বিষয়বস্তু প্রায়ই এতটাই বিস্তৃত ও জটিল হয় যে পাঠকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তৃতীয়ত, প্রতিবেদনগুলোর প্রচার ও বিতরণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক প্রতিবেদনই একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি। বিভিন্ন সংস্থা প্রায় একই ধরনের বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা প্রতিবেদন তৈরি করে, যা দ্বিত্বতা সৃষ্টি করে এবং সম্পদের অপচয় বাড়ায়। এ অবস্থায় পাঠকরা বিভ্রান্ত হন এবং কোন প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে পারেন না।
বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন
জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন শুধু প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েল-গাজা সংঘর্ষ থেকে শুরু করে রোহিঙ্গাসংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ- এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতিসংঘ বারবার সভা করে, প্রস্তাব পাস করে, কিন্তু কার্যকর কোনো সমাধান দিতে পারে না। এ ব্যর্থতা সংস্থাটির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
অনেক সমালোচক মনে করেন, জাতিসংঘ আজ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার কারণে বড় শক্তিগুলো তাদের স্বার্থবিরোধী যেকোনো প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। ফলে জাতিসংঘ প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে না।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
গুতেরেসের ‘ইউএন ৮০’ উদ্যোগ এ সমস্যা সমাধানের একটি প্রচেষ্টা। তিনি স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান পরিমাণ বৈঠক ও প্রতিবেদন ‘সহনসীমার প্রান্তে’ পৌঁছে গেছে। সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গুণগত মান বৃদ্ধি, পরিমাণ হ্রাস এবং প্রভাব বৃদ্ধি। প্রথমত, প্রতিবেদনগুলোকে আরও সহজ ও বোধগম্য ভাষায় লিখতে হবে। জটিল বিষয়গুলোকে সরলভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দ্বিত্বতা এড়াতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনের পরিবর্তে সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিবেদনগুলোর প্রচার ও বিতরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া, পডকাস্ট, ইনফোগ্রাফিক্স- এসব মাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যেতে পারে। চতুর্থত, প্রতিবেদনের প্রভাব পরিমাপের জন্য কার্যকর পদ্ধতি চালু করতে হবে।
ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ
আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্য ভোগের ধরন পাল্টে গেছে। মানুষ দীর্ঘ প্রতিবেদন পড়ার চেয়ে সংক্ষিপ্ত, দৃশ্যগত এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ কন্টেন্ট পছন্দ করে। জাতিসংঘকে এ পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হবে। ঐতিহ্যগত প্রতিবেদনের পাশাপাশি ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক্স, ইন্টারঅ্যাক্টিভ ড্যাশবোর্ড এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে তথ্য পরিবেশন করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি বাড়াতে হবে। জটিল বৈশ্বিক সমস্যাগুলোকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করে তরুণদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। এজন্য যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং ডিজিটাল মার্কেটিং পেশাদারদের সাহায্য নিতে হবে। কেবল রিপোর্ট বা দস্তাবেজ নয় বরং কার্টুন বা অন্য কোনো সহজবোধ্য উপায়ে প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
আঞ্চলিক ও স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতা
জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলো প্রায়ই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা হয়, যা স্থানীয় সমস্যা ও প্রেক্ষাপটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য একটি প্রতিবেদন তখনই গুরুত্বপূর্ণ হবে যখন তা স্থানীয় সমস্যা ও সমাধানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা- এসব বিষয়ে বৈশ্বিক তথ্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট যুক্ত করতে হবে। প্রতিবেদনগুলো স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করা এবং স্থানীয় মিডিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা জরুরি। এতে করে সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারকরাও বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলো অপঠিত থাকার আরেকটি কারণ হলো স্বচ্ছতার অভাব। অনেক প্রতিবেদনে তথ্যের উৎস স্পষ্ট নয়, গবেষণা পদ্ধতি বোধগম্য নয়, এবং সুপারিশগুলো বাস্তবসম্মত নয়। পাঠকরা যখন বুঝতে পারেন না যে, তথ্যগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কী ভিত্তিতে সুপারিশ করা হয়েছে, তখন তারা আস্থা হারিয়ে ফেলেন। প্রতিটি প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে কী পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, কারা গবেষণায় অংশ নিয়েছেন, এবং কীসের ভিত্তিতে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেদনের প্রভাব পরিমাপের জন্য নিয়মিত ফলো-আপ করতে হবে এবং সে ফলাফল জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
ভবিষ্যতের পথ ও সম্ভাবনা
জাতিসংঘের বর্তমান সংকট একটি সুযোগও বটে। এ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সংস্থাটি আরও কার্যকর, দক্ষ এবং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবেদনের সংখ্যা কমিয়ে গুণগত মান বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা এবং যোগাযোগ পদ্ধতির উন্নতি- এসব পদক্ষেপ নিলে জাতিসংঘ আবার তার হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পেতে পারে। প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং সাহসী সিদ্ধান্ত। সদস্য দেশগুলোকে বুঝতে হবে যে, অপ্রয়োজনীয় প্রতিবেদন ও বৈঠকে অর্থ খরচ করার চেয়ে প্রকৃত সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি। জাতিসংঘের নেতৃত্বকেও আরও সাহসী হয়ে অকার্যকর পদক্ষেপগুলো বন্ধ করতে হবে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং এটি বিশ্ব শাসনব্যবস্থার একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন। যখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনগুলো মানুষ পড়ে না, তখন তা শুধু অর্থের অপচয় নয়, বরং বহুপক্ষীয়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ সংকট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। যদি জাতিসংঘ তার কাজের ধরন পরিবর্তন করে, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে এবং মানুষের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে, তাহলে আবারও এটি বিশ্ব শান্তি ও সহযোগিতার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। এজন্য প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং পরিবর্তনের সাহস। জাতিসংঘের ৮০ বছরের যাত্রায় অনেক সাফল্য রয়েছে, কিন্তু বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো (যেমন- গাজা/ফিলিস্তিন ইস্যু, ইসরায়েলের আগ্রসী ভূমিকা সামলানো) মোকাবিলা করতে না পারলে ভবিষ্যতে এর প্রাসঙ্গিকতা আরও কমে যাবে। তাই এখনই সময় গভীর সংস্কারের মাধ্যমে একটি আধুনিক, কার্যকর এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য জাতিসংঘ গড়ে তোলার।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
.jpg)
.jpg)
