আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইসিএও) জাতিসংঘের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এ প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্ব হলো বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান চলাচলের অসামরিক এবং বাণিজ্যিক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও সিস্টেমকে রুলস্ এবং রেগুলেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত করা। আইসিএওর ভিশন হলো একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত ও টেকসই আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সিস্টেম নিশ্চিত করা; যা বিশ্বকে যুক্ত করবে সব দেশ এবং মানবজাতির কল্যাণের মধ্য দিয়ে।
১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটির নিরলস অগ্রগতিতে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল একটি অত্যন্ত জ্ঞানসমৃদ্ধ, প্রযুক্তিপ্রসূত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিশেষায়িত সিস্টেমে রূপায়িত হয়েছে। এই সিস্টেমের পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকবেন তাদের নিজস্ব উৎকর্ষতার জন্য প্রয়োজন আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযোগ এবং এভিয়েশনের প্রতি নিঃস্বার্থ অনুরাগ, যার সুবিচার কেবল এভিয়েশনের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরাই নিশ্চিত করতে পারবেন।
আইসিএওর সর্বশেষ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ২০ বছরের পূর্বাভাস অনুসারে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত বিমানের সংখ্যা ২০১০ সালে ছিল ৬১ হাজার এবং তা ২০৩০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হবে ১ লাখ ৫০ হাজার। বিমানের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৬ লাখ ৪৯ হাজার জন পাইলট, ৬ লাখ নতূন টেকনিশিয়ান এবং ১ লাখের ওপরে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের প্রয়োজন পড়বে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, যেখানে এভিয়েশন পেশাজীবীদের চাহিদা অত্যন্ত বাড়বে, সেটি হলো কেবিন ক্রুদের চাকরি। এভিয়েশন-শিল্পের সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হলো এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে। বাংলাদেশে এই ঘাটতি অগ্রহণযোগ্য।
এভিয়েশন বিজ্ঞানের ত্বরিত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ICAO, Next Generation of Aviation Professionals (NGAP) নামে এক বৈশ্বিক উদ্যোগের কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু করেছে। NGAP কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো পাঁচটি। সংক্ষেপে তা হলো: ১. বৈশ্বিক এভিয়েশন-শিল্পে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ পেশাজীবী (Aviation Professionals) তৈরি করা; ২. এভিয়েশন পেশাজীবীদের একটি বহুমাত্রিক এবং টেকসই গোষ্ঠী তৈরি করা; ৩. এভিয়েশন-শিল্পে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ডিজিটাল রূপান্তরকে প্রতিপালন করা; ৪. এভিয়েশন শিক্ষা কার্যক্রমের যুগোপযোগিতা এবং গুণগত মানের আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রাগ্রসরমান নিশ্চিত করা; ৫. সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানগুলো এবং এভিয়েশন-শিল্পের ভেতর ও বাইরে, রাষ্ট্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের মধ্যে সংলাপ, সহযোগিতা এবং পার্টনারশিপ কর্মসূচিকে উৎসাহিত করা। অতএব, দেখা যাচ্ছে যে NGAP কার্যক্রমটির দ্বারা ICAO বৈশ্বিক বিমান চলাচল সিস্টেমকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানভিত্তিক পেশায় রূপান্তরিত করতে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় যে রাষ্ট্রগুলো পশ্চাদে পড়বে, তাদের এভিয়েশন-শিল্পের বাজার অন্য রাষ্ট্রের দক্ষ জনশক্তি দ্বারা পূরণ ও দখল হবে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রের এভিয়েশন বাজার সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতি এবং আমলাতন্ত্রের শ্লথগতির কারণে ভগ্ন অবস্থায় পতিত হচ্ছে।
NGAP প্রক্রিয়াকে একটু সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, কোনো রাষ্ট্রের জন্য এভিয়েশন সিস্টেম একটি জাতীয় সার্বিক পদ্ধতির (Holistic Approach) ওপর নির্ভরশীল। এই পদ্ধতির একটি ত্রৈমাসিক কাঠামো (Trinity Structure) রয়েছে। এই কাঠামোটি সৃষ্টি হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Regulator), শিল্পক্ষেত্র (Industry) এবং একাডেমিয়ার মধ্যে একটি দৃঢ় প্রত্যয়ী সুসংহত যৌক্তিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। এই কাঠামোটি একটি সুচিন্তিত এবং সুপরিচালিত ব্যবস্থাপনা, যা বৈশ্বিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে সব দেশেই প্রযোজ্য। রেগুলেটরের দায়িত্ব অবশ্য অন্য দুটি স্তরের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার (Safety and Security) জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সংস্থার কাছে, যেমন ICAO, EASA (European Union Aviation Safety Agency) এবং যুক্তরাষ্ট্রের FAA (Federal Aviation Administration), রেগুলেটরকে জবাবদিহির আওতায় দায়বদ্ধ থাকতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের পক্ষে আন্তর্জাতিকভাবে বর্তায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB)-এর ওপর। CAAB-এর চেয়ারম্যান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে বৈশ্বিক সিভিল এভিয়েশনের মানদণ্ড প্রতিপালন করবেন, এটিই আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সিস্টেমের নীতিধর্ম, ব্যবস্থাপনা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। প্রায়ই আমরা এই ধ্রুব সত্যকে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে স্বীকার করি না এবং ভ্রমবশত মন্ত্রণালয়কে ICAO-এর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে মনে করি।
বিশ্ব বিমান চলাচল সিস্টেমে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অধিকর্তাকে সর্বোচ্চ দায়িত্ব দেওয়ার যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। বিমান চলাচলের সঙ্গে জড়িত প্রশাসন, পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো অত্যন্ত বিশেষায়িত একটি ব্যাপার। এই ব্যাপারটির বিভিন্ন প্রজ্ঞাপ্রসূত জ্ঞান রপ্ত করতে এবং তাকে পেশাগত দক্ষতায় উন্নীত করতে বছরের পর বছর কেটে যায়। অতএব, বেসামরিক বিমান চলাচলকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন, তার সেই এভিয়েশন পটভূমি (Background) না থাকলে এভিয়েশন ইনস্টিটিউশন হিসেবে গড়ে ওঠা মোটেই সম্ভব নয়। এবং এর ফলে যা হয় তাহলো, জাতীয় এভিয়েশন-শিল্পে এভিয়েশন-সম্পর্কিত জ্ঞান এবং বৈশ্বিক পেশাগত মানদণ্ড ধরে রাখতে না পারায় আন্তর্জাতিক মণ্ডলে রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির প্রচুর ক্ষতি হয়।
ইদানীং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা খর্ব করার একটি চেষ্টা চলছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। মন্ত্রণালয় এ ধরনের কোনো উদ্যোগে অভীষ্ট হলে তা বস্তুত জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি হবে। এখানে লক্ষ রাখতে হবে, মন্ত্রণালয়ের প্রায় কোনো কর্মকর্তাই এভিয়েশন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন এবং মন্ত্রণালয়ে পদায়নের আগে অধিকাংশের বেসামরিক বিমান পরিবহন সম্বন্ধে কোনো ধারণা থাকে না। সিভিল এভিয়েশনবিষয়ক জ্ঞান মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার পরই কিছুটা আহরণ করে থাকেন। এ কারণে এভিয়েশন নিয়ে যখনই কোনো জটিলতার সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে ফ্লাইং বা বিমান দুর্ঘটনা কিংবা এয়ার নেভিগেশন নিয়ে, তার উত্তর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে দিতে হয়। এর মূল কারণ হলো, তার পেশাগত জ্ঞানের প্রজ্ঞা এবং তার প্রতিনিয়ত অনুশীলনে যে যোগ্যতা ও দক্ষতা তিনি অর্জন করেন কর্মজীবনের শুরু থেকে এই বিশেষায়িত পেশার সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে তা অত্যন্ত মূল্যবান।
বাংলাদেশে আশির দশকের আগে বেসামরিক বিমান চলাচলের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব অর্পিত ছিল দুটি সংস্থার ওপর। একটি ছিল বেসামরিক বিমান দপ্তর (Department of Civil Aviation (DCA) এবং অন্যটি ছিল এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ (Airport Authority (AA))। DCA-এর অধিকর্তাকে বলা হতো মহাপরিচালক (Director General) এবং AA-এর অধিকর্তাকে বলা হতো চিফ ইঞ্জিনিয়ার। এই সংস্থা দুটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল। সংগত কারণেই বিমান চলাচলের প্রাসঙ্গিকতা বেসামরিক হওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে সংস্থা দুটিকে একত্রিত করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জন্ম হয়। বেবিচক বস্তুত নিয়ন্ত্রক ও সেবাপ্রদানকারী- এই দুই দায়িত্বই পালন করে আসছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল অ্যাক্ট, ২০১৭; বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৭ এবং বেসামরিক বিমান চলাচল রুল, ১৯৮৪ অনুযায়ী ICAO কর্তৃক নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশ সরকার CAAB-এর চেয়ারম্যানকে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। এর ফলে ICAO ও EASA যখন সিভিল এভিয়েশনের অডিটের জন্য আসবে, তখন প্রথম প্রটোকল প্রশ্নই হবে কর্তৃপক্ষ হিসেবে CAAB স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে কি না। এখানে ভুললে চলবে না যে CAAB-কে এই দুর্বলতার জন্য ২০০৯ সালে ICAO কর্তৃক অডিট সংঘটিত হলে Significant Safety Concern (SSC) (উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা উদ্বেগ)-এর আওতাভুক্ত করা হয়েছিল। অনবরত দুই বছর পর প্রচুর পরিশ্রম এবং চেষ্টার ফলে CAAB নিজেকে ২০১২ সালে SSC থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। CAAB-এর পেশাগত অর্জন এবং ক্ষমতাকে খর্ব করা হলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলে প্রতীয়মান হবে।
এখানে একটি ব্যাপার বিশেষভাবে বিবেচ্য। সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং ক্রয় করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্ত জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচলকে শক্তিশালী এবং সুসংহত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের Federal Aviation Administration (FAA) এ পর্যন্ত তাদের প্রটোকল প্রশ্নের অন্যতম প্রণিধানযোগ্য শর্ত CAAB-এর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন (Full Autonomy) না থাকায় CAAB-এর রেগুলেটরি স্টেটাস এখন পর্যন্ত ক্যাটাগরি-২-তে রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় কর্তৃক CAAB-এর স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা হলে FAA কখনো CAAB-কে ক্যাটাগরি-১-এ উন্নীত করবে না। তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান ক্রয় করার পরও কোনো বিমান যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাই করতে পারবে না। বোয়িংয়ের দূরপাল্লার রুটে ব্যবহার নিশ্চিত না হলে বিমানগুলোর যথাযথ ব্যবহার হবে না এবং তা হবে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। এখানে আমরা স্মরণ করতে পারি যে চেয়ারম্যানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন না থাকার কারণে ২০০৭ সালে CAAB-কে Category-I থেকে Category-II-তে অবমূল্যায়ন করা হয়। অথচ ২০১০ সালে আমরা বোয়িং-৭৭৭ দূরপাল্লার বিমানগুলো ক্রয় করি। পরবর্তী সময়ে এই বোয়িংগুলো স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় ব্যবহার করতে আমরা বাধ্য হই। এর ফলে বিমানের Cycle Cost বেশি হওয়ায় বিমানকে অকার্যকর ব্যয়ের (Ineffective cost) সম্মুখীন হতে হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে CAAB-এর Full Autonomy একটি non-negotiable বিষয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল সম্পর্কিত ২০১৭ সালে আইন দুটি সংসদ কর্তৃক গৃহীত। অতএব, উভয়েরই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অর্গানের সাংবিধানিক বৈধতা রয়েছে। আইন দুটিতে চেয়ারম্যানের ক্ষমতার পরিষ্কার নির্দেশ ও ইঙ্গিত দেওয়া আছে। এই আইন দুটির যেকোনো ধরনের সংশোধন কেবল সংসদেই আলোচনা হতে হবে। বর্তমানে সংসদের অনুপস্থিতিতে এই আইন দুটির ওপর মন্ত্রণালয়ের দ্বারা আরোপিত পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা সংশোধনকে ভবিষ্যতে সংবিধানের স্বীকৃত আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিযুক্ত করার আশঙ্কা রয়েছে।
CAAB একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করে আসছে। এই দায়িত্ব যাতে CAAB আরও সুষ্ঠু এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পালন করতে পারে, সে জন্য মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো CAAB-এর কার্যক্রমকে সহজতর ও গতিশীল করতে সহায়কের ভূমিকা পালন করা। এই বাস্তব সত্যটি অনুধাবন না করতে পারলে তা হবে জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য এক আত্মঘাতী ঘটনা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা এবং সিএএবির সাবেক চেয়ারম্যান
.jpg)
.jpg)
.jpg)