জুলাই বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ এক পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এখন অনেক কিছুই নতুন করে ভাবা ও করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যমান নীতিকৌশলগুলো সময়োপযোগী করে নেওয়ার এখনই সময়। জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নীতিকৌশলগুলো পরিবর্তন এবং পরিমার্জন করতে যদি না পারা যায়, তাহলে আগস্ট বিপ্লবের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। '৯০-এ দশকে ইউক্রেনে সংঘটিত মহাদুর্নীতির কথা বিশ্বব্যাংকের কথায় এসেছে এবং তাতে বলা হয়েছে, ছোট ও মাঝারি দুর্নীতি যত সহজে চোখে পড়ে, মহাদুর্নীতির বেলায় তা ঘটে না।...

জ্বালানি মানুষের মৌলিক অধিকার। সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) অর্জন করতে চাই। আমরা চতুর্থ বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই অর্জন করা সম্ভব নয়, যদি ভোক্তাশ্রেণিনির্বিশেষে ক্রয়ক্ষমতায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা না যায়। অথচ আমরা বছরের পর বছর জ্বালানি বুভুক্ষার শিকার। পুষ্টিহীন অর্থনীতির কঙ্কালসার দশায় সরকার ডলার ও টাকার তীব্র সংকটের কারণে ভয়ানকভাবে জ্বালানি নিরাপত্তাহীন। কোনো ভোক্তা প্রাপ্ত বিদ্যুৎ বা অন্য কোনো জ্বালানি দিয়ে কী করবেন তা আলাদাভাবে বাছাই করার সুযোগ নেই। একজন ভোক্তা প্রাপ্ত বিদ্যুৎ দিয়ে ঘরের বাতি জ্বালাতে পারেন অথবা ঘরের হিটিং চালাতে পারেন অথবা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে অন্য কোনো কাজ করতে পারেন, এটি একান্তই তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এ ব্যাপারে সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। কিন্তু ভর্তুকি ও জ্বালানি ঘাটতি বা স্বল্পতার কারণে বাংলাদেশে তা সরকার কর্তৃক প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত।
জুলাই বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ এক পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এখন অনেক কিছুই নতুন করে ভাবা ও করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যমান নীতিকৌশলগুলো সময়োপযোগী করে নেওয়ার এখনই সময়। জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নীতিকৌশলগুলো পরিবর্তন এবং পরিমার্জন করতে যদি না পারা যায়, তাহলে আগস্ট বিপ্লবের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। অতীতে জ্বালানি খাত পরিচালনা ও উন্নয়নে যেসব নীতিকৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, তাতে জ্বালানি নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে। সঠিক তথা ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যহারে ভোক্তার জন্য বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাথমিক জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাস প্রাপ্তির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
পৃথিবীর জ্বালানির প্রায় সর্বাংশের উৎস সূর্য হলেও পৃথিবীজুড়েই ভূমি ও সাগরের অভ্যন্তরে যে পরিপূরক জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তার মালিকানা রাষ্ট্র তথা জনগণের। কিন্তু যারা বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি সম্পদ জনগণের নামে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও সমর্থনে লেনদেন করেছেন, তারা জনগণের অধিকার খর্ব করে কতিপয় দুর্ভেদ্য অধিকার বা অলিগার্ক সৃষ্টি করেন। এ অবস্থার পরিবর্তন করা দরকার সবার আগে। অধ্যাদেশে সংযোজিত ওই দফা ২(২)(ক) ও (খ) বাতিল না হলে এ পরিবর্তন হবে কীভাবে? অতীত লুণ্ঠনের বিচার না হলে আগামীতে জ্বালানি খাত লুণ্ঠনমুক্ত হবে কীভাবে? ক্যাব সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালের দ্বারা বিগত ১৫ বছরের লুণ্ঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত সুনির্দিষ্ট চারজন বিশিষ্ট অপরাধীসহ সব জ্বালানি অপরাধীদের বিচার চায়। লুণ্ঠনমুক্ত জ্বালানি খাত উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্যাব বিইআরসি আইনের আমূল সংস্কার চায় এবং ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪-এর ভিত্তিতে বাণিজ্যিক নয়, সরকারি সেবা খাত হিসেবে জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য জাতীয় জ্বালানি নীতি চায়।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবয়ব, বিশেষ করে জ্বালানি খাত যদি লুণ্ঠনমূলক শোষণের চিত্র ধারণ করে, তাহলে দুটি বিষয় অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এর একটি জ্বালানি অবিচার এবং অন্যটি জ্বালানি দারিদ্র্য। জ্বালানি অবিচার এবং জ্বালানি দারিদ্র্য অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ জ্বালানি অবিচার থেকে জ্বালানি দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। সাধারণভাবে জ্বালানি দারিদ্র্য বলতে আধুনিক জ্বালানি সেবাসমূহে নাগরিকদের প্রবেশাধিকারের অভাবকে বোঝায়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল সূত্র হচ্ছে জ্বালানি সেবায় অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত থাকা। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান প্রতিটি মৌলিক অধিকারই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানি দারিদ্র্য বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে একজন ব্যক্তি রান্নার প্রয়োজনে বছরে মাথাপিছু ৩৫ কেজি এলপিজি না পাওয়া বা ব্যবহার করতে না পারা অথবা বার্ষিক মাথাপিছু ১২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করার মতো তার সামর্থ্য না থাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বালানিতে প্রবেশাধিকার থাকলেও ব্যবহারে প্রবেশ অধিকার অধিকাংশ ভোক্তার খুবই সীমিত। অর্থাৎ জ্বালানির ওপর অধিকাংশ ভোক্তা স্বত্বাধিকার অর্জনে সক্ষম নয়। ফলে প্রবেশাধিকার সেখানে অর্থহীন। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনের ধারণা অসম্পূর্ণ।
জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে লুণ্ঠনমূলক ব্যয়বৃদ্ধির কারণে মূল্যহার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না থাকায় ভোক্তা ও সরকার উভয়ই এখন রীতিমতো জ্বালানি অধিকার বঞ্চিত এবং জ্বালানি দারিদ্র্যের শিকার। অথচ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন-২০০৩ ছাড়াও বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধান দ্বারা জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করে রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছে। ওপরে বর্ণিত প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত সরকারের আমলে তা মোটেও কার্যকর ছিল না। বর্তমান সরকারের আমলেও সে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোনো জ্বালানি অপরাধী চিহ্নিত হয়নি। কাউকেই এখনো বিচারের আওতায় আনা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যিনি অভিযুক্ত তাকেই তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ফলে বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় ও মূল্যহার উভয়ই অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করায় ভোক্তা লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে। এর কোনো প্রতিকার ও প্রতিরোধ হয়নি। এখনো তা অব্যাহত ও সুরক্ষিত। ন্যূনতম ব্যয়ে জ্বালানি সরবরাহ ও ন্যায্য মূল্যহারে জ্বালানিপ্রাপ্যতা এখনো বিপন্ন এবং ভোক্তা জ্বালানি অধিকার বঞ্চিত।
সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কারণে জ্বালানি খাতে দুর্নীতির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। সরকার-সমর্থক একটি গোষ্ঠী জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধির নামে বিগত সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুণ্ঠন করেছে। বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্রে এর প্রমাণ খানিকটা পাওয়া যায়। জ্বালানি সরবরাহ চেইনের পুরোটাই সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা হলে তিতাস গ্যাসের মতো সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠে দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্য পরিচালক। আবার সরকারের দুর্নীতির অংশীদার হিসেবে যখন ব্যক্তি খাত এগিয়ে আসে, সেখানেও কোনো জবাবদিহি সৃষ্টি হয় না। বরং তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়ে। ফলে একচেটিয়াবাদের কোনো পরিবর্তন হয় না। বিগত সরকারের আমলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে লুণ্ঠনের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে জ্বালানি সংস্কার জরুরি। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে জ্বালানিতে লুণ্ঠন ও দুর্নীতি চলছে, চলবে- ভোক্তাদের এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
অন্য যেকোনো অবকাঠামো খাতের চেয়ে বিদ্যুৎ খাতে নগদ অর্থ সৃষ্টির সুযোগ অনেক বেশি থাকে। বিশ্বব্যাংক বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতিতে তিনটি বিভাজন শনাক্ত করেছে। এগুলো হচ্ছে: (১) ছোট দুর্নীতি (যেমন- মিটার রিডার ও কারিগরি কর্মচারীদের দুর্নীতি), (২) মাঝারি দুর্নীতি (যেমন- কোম্পানি ম্যানেজার ও মধ্যস্তরের আমলা ও তাদের প্রশ্রয়ে সংঘটিত দুর্নীতি) এবং (৩) মহাদুর্নীতি বা গ্রান্ড করাপশন (পাবলিক বা প্রাইভেট কোম্পানিকে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার দেওয়ার বিনিময়ে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে গোষ্ঠীর নামে ও নিজের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থ তুলে নেওয়া, যার বড় অংশই সুবিধাদানকারীর নির্ধারিত বৈদেশিক অ্যাকাউন্টে পাচার হয়। মহাদুর্নীতি সরকারের শীর্ষ মহলের আশীর্বাদ ছাড়া করা সম্ভব নয়। এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠিত।
বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০-এর আওতায় প্রায় দেড় দশক ধরে মহাদুর্নীতি চলেছে। বর্তমান সরকারের আমলে ওই আইন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে রহিত করা হলেও সেসব মহাদুর্নীতিকে এ অধ্যাদেশেই সুরক্ষা তথা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ’৯০-এ দশকে ইউক্রেনে সংঘটিত মহাদুর্নীতির কথা বিশ্বব্যাংকের কথায় এসেছে এবং তাতে বলা হয়েছে, ছোট ও মাঝারি দুর্নীতি যত সহজে চোখে পড়ে, মহাদুর্নীতির বেলায় তা ঘটে না। রাষ্ট্র আড়াল করে। আমাদের ক্ষেত্রেও কি রাষ্ট্র আড়াল করছে না?
লেখক: জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব
.jpg)


