ঢাকা শহরের নদীর ৯০ ভাগই অকেজো হয়ে আছে। এর জন্য সরকারি সংস্থা, ওয়াসা, ঢাকা-চিটাগং-খুলনা এরাই দায়ী। তাছাড়া আমাদের কলকারখানার লিকুইড বর্জ্যের সলিড বর্জ্যের কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ, যত্রতত্র লিকুইড বেজড ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এখন ঢাকার কথা যদি বলি- ইতোমধ্যে সার্ভে করে কোন পয়েন্ট থেকে বর্জ্য নিষ্কাষিত হয়, কারা পরিশোধন করে না, তা চিহ্নিত করা হয়েছে।...

আমাদের সংবিধানের ১৮ (ক) ধারার মধ্যে পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে- রাষ্ট্র পরিচালিত হবে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বনভূমি ইত্যাদির সংরক্ষণ করে। আমাদের যারা আইনপ্রণেতা তারা, যাদের আইন রক্ষা করার কথা, অর্থাৎ, সংসদ সদস্য- তারাই এটার মেইন ভায়োলেট। আমরা পরিবেশের কথা বুঝি না, মিটিংয়ে গিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলি। তারা এই দূষণ, সেই দূষণ করছে। কারা বায়ুদূষণ করছে? কারা পানিদূষণ করছে? কারা ভূমিদূষণ করছে? কারা শব্দদূষণ করছে? এসব দূষণের শীর্ষে আছেন যারা দেশ পরিচালনায় আছেন, তারাই। কাজেই যতদিন আমাদের শিল্পপতিরা, আমাদের ব্যবসায়ীরা দূষণ করা থেকে বিরত থাকবেন, ততদিন দেশ ভালো থাকবে। তারা মনে করেন, ফ্রি কান্ট্রি- যার যা খুশি তাই করবেন। দুঃখের কথা এটাই যে, এ দেশে আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই!
বায়ুদূষণের প্রধান উৎস চিহ্নিত হয়েছে এবং পরিমাণটাও নির্ধারিত হয়েছে। আমি একসময় পদ্মা সেতুর সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সেখানে তাদের কন্ট্রাকটরকে যে নির্দেশ দেওয়া ছিল- এ এলাকায় কোনো ধুলা উড়তে পারবে না। তারা পর্যায়ক্রমে নদীর পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখত। দ্বিতীয় কারণ হলো- গাড়ির কালো ধোঁয়া। গাড়ির পেট্রোল ঠিকমতো না পুড়লে সেখান থেকে কালো ধূলিকণা নির্গত হয়। একটা গাড়ির পেছনে ভগ ভগ করে যদি কালো ধোঁয়া বের হয়- তা হলে বুঝতে হবে ইঞ্জিন ঠিকমতো পেট্রোলকে ব্যবহার করতে পারছে না, পোড়াতে পারছে না। ঠিকমতো যদি পুড়ত তাহলে কিন্তু কোনো ধোঁয়া বেরোত না। একটা বাসের যদি ক্ষমতা থাকে ৪০ জন প্যাসেঞ্জার বহন করবে, সেখানে প্রায়শই দেখা যায় ৭০ থেকে ৮০ জন প্যাসেঞ্জার বহন করে এবং তারা প্রচুর মালপত্র নিয়ে চলাচল করে। এটাকে আমাদের কমানো যেতে পারে। ট্রাক-বাস ওভার লোডিং দেওয়া যাবে না। এটা রাস্তারও ক্ষতি করে। তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে- ভাটা। ইটের ভাটায় যে পরিমাণ কালো ধোঁয়া বের হয়- কয়লা দিয়েই হোক আর ফুয়েলই ব্যবহার করে হোক। মূলত ভাটাগুলোয় লাকড়ি ব্যবহার করা হয়- এতে ভয়ংকর অবস্থা ধারণ করে। যেমন- মিরপুরে একটা ব্রিক ফ্যাক্টরি আছে, ক্যান্টনমেন্টের পাশে। সেখানে তো কোনো বায়ুদূষণ নেই। অর্থাৎ, প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ফ্যাক্টরিগুলো করা উচিত। চতুর্থ হচ্ছে- পাহাড়ের যে ধুলা। ভারতের দিল্লি, বাংলাদেশের ঢাকা, বায়ুদূষণে কেউ প্রথম আবার কেউ দ্বিতীয় হয়ে থাকে। ওদের কারণ হচ্ছে- শহরের বাইরে চারপাশে যে ফসলের খেত আছে- গম কিংবা ধানের খড়গুলো তারা পুড়িয়ে দেয়। সেখান থেকে প্রচুর ধোঁয়া হয়। আমাদের দেশে সেটা নেই। কিন্তু শহরের রাস্তাঘাটে যে পরিমাণ ধুলাবালি, মাটি থাকে, সেটা থেকে বায়ুদূষণ হচ্ছে। সিটি করপোরেশন সেখানে পানি দিয়ে ধুলাটা কমানোর চেষ্টা করছে। মূল কথা হচ্ছে- আমরা সমাধান জানি, এটার বাস্তবায়ন আমাদের ঘটাতে হবে।
অবশ্যই ঢাকার অবস্থা সব থেকে খারাপ। এর কারণগুলো জানা থাকলে সেটাকে শোধরানো সম্ভব।
প্রথমত, আমার অভিযোগ হচ্ছে- নির্মাণসামগ্রীর ব্যবস্থাপনা। দেশ বড় হচ্ছে, মানুষের অবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে, ভবন নির্মাণ প্রয়োজন, বাড়িঘর নির্মাণ প্রয়োজন, রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রয়োজন। এ কাজে বালু, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার হয়। এগুলোকে আমরা যথাযথভাবে ঢেকে রাখি না। সামান্য বাতাসেই এগুলো থেকে প্রচুর ধুলা ওঠে। এখন এই ধুলাটা বুঝতে হবে। এর দুটি সাইজ আছে- একটি হচ্ছে ১০ মাইক্রো (অর্থাৎ ১০ লাখ ভাগের ১০ ভাগ), আরেকটি হচ্ছে ২ দশমিক ৫ মাইক্রো। অর্থাৎ এ মাইক্রো আমরা খালি চোখে দেখি না। এ সূক্ষ্ম বালুকণা যদি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে, সেখানে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এটা খুব সহজেই অর্জন করা যায়। যেখানে রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে, সেখানে মাটি শুকাতে দেওয়া যাবে না। পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। যেখানে বালু রাখা আছে, বালুটাকে ভিজিয়ে রাখলেই হলো। যেখানে ইট স্তূপ করে রাখা আছে, সেটাকে ভিজিয়ে রাখলেই কিন্তু এই ক্ষুদ্র ধূলিকণার উৎপত্তি হয় না। এটা অবশ্যই অতি সহজ কাজ। এটার জন্য যারা নির্মাণ করছেন, সরকারি নির্মাণকাজ বা বেসরকারি নির্মাণকাজ, ব্যক্তিগত নির্মাণকাজ- তারা এটাকে কন্ট্রোল করতে পারেন। বিশেষ করে এটা রাস্তারও ক্ষতি করে।
আমাদের দেশে পয়োনিষ্কাশন নেই। ঢাকা শহরে পয়োনিষ্কাশন নেই। গুলশান, বারিধারা, বনানীতে থাকেন শহরের উচ্চবিত্তদের একটা গ্রুপ। তাদের কি স্যানিটারি সিস্টেম আছে? নেই। ব্যবস্থার অভাবে শহরের নদীগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে নদীদূষণ করে দুই গ্রুপ। এক. সরকারি, দুই. প্রাইভেট সেক্টর। ঢাকা শহরের নদীর ৯০ ভাগই অকেজো হয়ে আছে। এর জন্য সরকারি সংস্থা, ওয়াসা, ঢাকা-চিটাগং-খুলনা এরাই দায়ী। তাছাড়া আমাদের কলকারখানার লিকুইড বর্জ্যের সলিড বর্জ্যের কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ, যত্রতত্র লিকুইড বেজড ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এখন ঢাকার কথা যদি বলি- ইতোমধ্যে সার্ভে করে কোন পয়েন্ট থেকে বর্জ্য নিষ্কাষিত হয়, কারা পরিশোধন করে না, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধে যদি আইন প্রয়োগ করা হয় কিংবা শিল্পপতিরা যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগুলো ঠিক করে, তাহলে এ থেকে উদ্ধার হওয়া সম্ভব। আমাদের দেশে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজগুলো চেষ্টা করছে, কিন্তু হচ্ছে না। অথচ লেবার ইন্ডাস্ট্রি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ইন্ডাস্ট্রি। আমি মনে করি, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে যদি আমাদের লেবার ইন্ডাস্ট্রিগুলো ঠিকমতো পরিশোধনের কাজ না করে তাহলে তাদের নিজেদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে। যে কয়টা লেবার কোম্পানি বর্জ্যব্যবস্থাপনাসহ কারখানা অপারেট করে সেগুলো রপ্তানি করতে পারছে। বাকিগুলো পারছে না কেন? মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টা কোম্পানি পারে। ৩০০ থেকে ৪০০ কারখানা পারে না। শুধু এই বর্জ্য ফেলে নদীদূষণের কারণে দেশবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার সঙ্গে বিশ্ব সজাগ হয়ে বলছে- তোমরা যদি ক্লিন না কর, তাহলে তোমাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেব। কাজেই এটাকে সিরিয়াসলি নিতে হবে। আমি মনে করি, এর জন্য পর্যাপ্ত আইন আছে। আইন থাকলে তো হবে না, তার প্রয়োগ থাকতে হবে। এ প্রয়োগটা নেই। আবারও বলছি, এ প্রয়োগটা সরকারি-বেসরকারি মহল এবং প্রাইভেট মহল- দুই দিক থেকেই করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণে এনে কীভাবে পরিবেশসম্মতভাবে জনজীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলা যায়, তার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকে। আমরা সেগুলোতে সই করে আসছি। সে অনুযায়ী দেশের ভেতরেও অ্যাকশন প্লান্ট তৈরি করি। যেমন- সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি)-এর ১৭টি গোল আছে। এই ১৭টার মধ্যে অ্যাকচুয়ালি ১৬টি ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন। সেটার মাধ্যমে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এর আগে যে সরকার ছিল- তাদের সিনিয়র মোস্ট সেক্রেটারির দায়িত্ব ছিল এই টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে চালু রাখা। দূষণ বলি আর নগরায়ণ বলি কিংবা খাদ্যনিরাপত্তা বলি- সবকিছু তাদের দায়িত্ব ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারেও একজনকে সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্বে আইন আছে। সে অনুযায়ী আমাদেরও আইন আছে। আমরা সবাই বুঝি কী করতে হবে। কিন্তু আমরা করি না। অর্থাৎ, আমরা জ্ঞানপাপী। দেশের যে আইন আছে, নীতি আছে- সবই ঠিক আছে। সংস্থা আছে, কোনো ইমপ্লিমেন্টেশন বা প্রয়োগ নেই। এটার জন্য একটা জিনিস মিসিং, সেটার জন্য আমরা সংক্ষেপে বলি (MEL) মনিটরিং ইভেল্যুয়েশন অ্যান্ড লার্নিং। মনিটরিং ইভেল্যুয়েশনের জন্য আমাদের দপ্তর আছে। কর্মকর্তা আছে। কিন্তু মনিটর করে কিছু শিখি না। কাজেই আমাদের কাজ আমাদেরই করতে হবে। আমি মনে করি, এটা অর্জন করা সম্ভব। ইইউ বা অনেক দেশ একসময় তারা গাছপালা কেটে, বন কেটে একটা বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। তাদের বড় বড় নদীগুলো ছোট হয়ে গিয়েছিল। তারা সব পরিষ্কার করেছে। তারা শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। পৃথিবীতে যথেষ্ট নজির আছে। আমাদের আইন আছে, পলিসি আছে, কর্মকর্তা আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। এ কাজটা দ্রুত করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া তাদের জনজীবনের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে না
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

