ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের ঠিক দেড় মাস আগে ১৭ বছর পর বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্বদেশে তিনি পেয়েছেন স্মরণকালের বিপুল রাজসিক ও বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা। দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া প্রথম বক্তৃতায় তিনি দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন। বিশিষ্টজনরা বলছেন, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন দেশের মানুষকে দিয়েছে এক নতুন বার্তা।
বিশিষ্টজনদের অভিমত-
সরকার গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকবে আশা করছি: দিলারা চৌধুরী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমরা প্রথমেই তাকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাই। তার বক্তব্য আমি মনোযোগ দিয়ে শুনেছি।
প্রথমত, তার আগমন ও বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমার মনে হয়। ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এই অর্থে যে, তার আগমনের ফলে তার পার্টির তৃণমূলে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে নমিনেশন নিয়ে, অন্য সমস্যাও আছে, সেগুলো তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন বলে আমি আশা করি। পার্টির মধ্যে তিনি একটা ডিসিপ্লিন, যা তার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ; সেটাও মোকাবিলা করতে পারবেন বলে আমি মনে করি। এটা করতে না পারলে নির্বাচনের জন্য যে আবহাওয়া তৈরি করতে হয়, সেটা তৈরি করতে অসুবিধা হবে ইলেকশন কমিশনের। তিনি হয়তো এটা করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, বিএনপির কোনো কোনো সদস্যের মন্তব্যে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল; বিএনপি হয়তো জুলাইয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারছে না। তিনি সেই বিভ্রান্তি দূর করেছেন। নাম নেননি, কিন্তু আধিপত্যবাদের কথা বলেছেন, তিনি হাদির কবর জিয়ারত করতে যাবেন। তার মানে তিনি এখানে সমঝোতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন সব দলের সঙ্গে, বিশেষ করে যারা নতুন জেনারেশন তাদের সঙ্গে। কারণ প্রায় চার কোটি তরুণ ভোটার আছে।
তারেক রহমান তার বক্তৃতায় ভীষণ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন এবং সবার দিকেই তিনি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দেখা যাক, সামনে নির্বাচন, নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কা ছিল, সেই শঙ্কাও দূরীভূত হয়েছে। তার আগমনকে অবশ্যই স্বাগত জানাই এবং যে সরকার আমরা গঠন করতে যাচ্ছি, সেই সরকার গঠনে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকবে বলে আমি আশা করছি।
আশা করছি প্ল্যানে অর্থনীতি গুরুত্ব পাবে: মীর নাসির হোসেন, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি
তারেক রহমান যেভাবে সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দেশে ফিরলেন, তাতে মার্টিন লুথার কিং ও নেলসন ম্যান্ডেলার কথা মনে পড়ছে। তারেক রহমানের আগমন বাংলাদেশে নতুন বার্তা দিচ্ছে।
সেই নতুন বার্তা রাজনীতিতে যেমন, তেমনি অর্থনীতিতেও আসবে। মনে রাখতে হবে, রাজনীতি ও অর্থনীতি একটি অন্যটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা ব্যবসায়ীরা চাই, দেশে আধুনিক ও গতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন তারেক রহমান।
তারেক রহমানের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আমরা ব্যবসায়ীরাও আশায় আছি।
একটি অনির্বাচিত সরকার অনেক কিছু চাইলেও করতে পারে না। দেশের অর্থনীতির অনেক খাত এখন এলোমেলো। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক খাতে গতি আনার চেষ্টা করলেও আশানুরূপ গতি আসেনি। বিনিয়োগ বাড়ছে না, কর্মসংস্থান নেই, শিল্পে সুবাতাস নেই। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে, রপ্তানিতে নেতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। ব্যাংক খাত এখনো ঠিকঠাক হয়নি। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট রয়ে গেছে।
দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে টেকসই রাজনৈতিক চর্চা সম্ভব নয়। আমরা বিনিয়োগকারী ও শিল্পোদ্যোক্তারা আশা করছি, তারেক রহমান অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে কাজ করবেন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করবেন।
তারেক রহমান দেশে আসার পর প্রথম ভাষণেই একটি নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান। সংক্ষিপ্ত ভাষণ বলে তিনি এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। আমরা সেই প্ল্যান সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। আমরা ব্যবসায়ীরা আশা করছি, তারেক রহমানের সেই প্ল্যানের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে থাকবে অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর কথা। তিনি এমন নতুন বার্তা দেবেন, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ধারার সূচনা করবে।
দেশে ফেরার প্রথম দিনেই তারেক রহমানের আচরণ ছিল সংযত ও ধীর-স্থির। তিনি তার বক্তৃতায় শান্তির ডাক দিয়েছেন। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথা বলেছেন। এতে আমরা আশা করছি, অর্থনীতিতে বিভেদ দূর হবে, দুর্নীতি কমবে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।
বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক: জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ
ওসমান হাদির মৃত্যু, দেশব্যাপী সহিংসতার মধ্য দিয়ে আমরা পার হচ্ছি। এসবের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা শান্তি, স্বস্তি, সহনশীলতার বার্তা নিয়ে এল।
তারেক রহমানের কয়েকটি ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়েছে। জুতা খুলে মাটিতে পা স্পর্শ করা, বুলেট প্রুফ গাড়িতে না উঠে সবাইকে নিয়ে বাসে ওঠা, মঞ্চে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা, মাকে দেখতে যাওয়ার আগে জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ–এসব ঘটনা আমাকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা লম্বা ভাষণ দেন। তারেক রহমান তা করেননি। তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষণে প্রতিহিংসার বদলে শান্তির ডাক দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিল। সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত হয়েছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এ ভালোবাসার মোহে যেন আশাভঙ্গ না হয়। ইতিবাচক এই সূচনাকে দীর্ঘায়িত করতে হবে।
তিনি বলেছেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান, কিন্তু আমরা এখনো জানি না সেই প্ল্যানে কী আছে। এই প্ল্যানের কথা বলে তিনি তার চলার পথে তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছেন। এই প্ল্যানের বিষয়টি সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। এই প্ল্যানে আর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সব থাকতে হবে।
তারেক রহমান বাংলাদেশে আসায় যারা নির্বাচনকে বানচাল করতে চায়, তাদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে গিয়েছে। সেটি হলো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে যে ট্রেন চলা শুরু করেছে, তা আর থামানো যাবে না।
তারেক রহমানের ভাষণের মঞ্চে বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের দেখতে পেয়েছি। আশা করছি, তারেক রহমানের উপস্থিতিতে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সুসম্পর্ক বাড়বে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে, তবে নির্বাচন করতে হবে এ বিষয়ে সবাই একমত বলেই মনে করছি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।


.jpg)