আমাদের যারা আইনপ্রণেতা তারা, তাদের আইন প্রণয়ন করার কথা, কিন্তু তারাই আইনের লঙ্ঘন করছেন। সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, এই দূষণ, সেই দূষণ করা হচ্ছে। কারা বায়ুদূষণ করছে? কারা পানিদূষণ করছে? কারা ভূমিদূষণ করছে? কারা শব্দদূষণ করছে? এসব দূষণের শীর্ষে আছেন যারা দেশ পরিচালনায় আছেন, তারাই। তারা মনে করেন, সবাই স্বাধীন। যার যা খুশি তাই করবেন। দুঃখের কথা এটাই যে, এ দেশে আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই!...
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশ। প্রাকৃতিকভাবে পানি না পেয়ে বছরের নির্দিষ্ট সময় সেচের ওপর নির্ভর করতে হয় বাংলাদেশকে। এমনকি রাজধানীর কিছু এলাকায় পানির সংকট লেগেই রয়েছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বাড়ছে; সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে পানির চাহিদা। আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা আছে কিন্তু বাস্তবায়নটা এখনো সমন্বিতভাবে হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে টানা খরায় ফসলহানি দেখেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশেও বৃষ্টির অভাবে সেচের পরিমাণ বাড়াতে হয়েছে কৃষকদের। এমন বাস্তবতায় পানির গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও আলোচনা চলমান রয়েছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় খরার প্রভাবে কমেছে গমসহ বিভিন্ন সবজি ও ফলের উৎপাদন। খরার প্রভাবে ইউরোপ টমেটো উৎপাদনে বিপর্যয় দেখেছে। পানির অভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিঘ্নিত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন। বাংলাদেশেও পানির অভাবে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে কৃষকদের।
আমাদের যারা আইনপ্রণেতা তারা, তাদের আইন প্রণয়ন করার কথা, কিন্তু তারাই আইনের লঙ্ঘন করছেন। অনেকে মিটিংয়ে গিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, এই দূষণ, সেই দূষণ করা হচ্ছে। কারা বায়ুদূষণ করছে? কারা পানিদূষণ করছে? কারা ভূমিদূষণ করছে? কারা শব্দদূষণ করছে? এসব দূষণের শীর্ষে আছেন যারা দেশ পরিচালনায় আছেন, তারাই। কাজেই যতদিন আমাদের শিল্পপতিরা, আমাদের ব্যবসায়ীরা দূষণ করা থেকে বিরত থাকবেন, ততদিন দেশ ভালো থাকবে। তারা মনে করেন, সবাই স্বাধীন। যার যা খুশি তাই করবেন। দুঃখের কথা এটাই যে, এ দেশে আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই!
বায়ুদূষণের প্রধান উৎস চিহ্নিত হয়েছে এবং পরিমাণটাও নির্ধারিত হয়েছে। ইটের ভাটায় যে পরিমাণ কালো ধোঁয়া বের হয়- কয়লা দিয়েই হোক আর ফুয়েলই ব্যবহার করেই হোক; মূলত ইটের ভাটাগুলোতে লাকড়ি ব্যবহার করা হয়- এতে পরিবেশের ভয়ংকর ক্ষতি হয়। যেমন- মিরপুরে একটা ব্রিকস ফ্যাক্টরি আছে, ক্যান্টনমেন্টের পাশে। সেখানে তো কোনো বায়ুদূষণ নেই। প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ফ্যাক্টরিগুলো করা উচিত। এ ছাড়া ভারতের দিল্লি, বাংলাদেশের ঢাকা, বায়ুদূষণে কেউ প্রথম আবার কেউ দ্বিতীয় হয়ে থাকে। ওদের কারণ হচ্ছে- শহরের বাইরে চারপাশে যে ফসলের খেত আছে- গম কিংবা ধানের খড়গুলো তারা পুড়িয়ে ফেলে। সেখান থেকে প্রচুর ধোঁয়া হয়। শহরের রাস্তাঘাটে যে পরিমাণ ধুলাবালি থাকে, তা থেকে বায়ুদূষণ হচ্ছে। সিটি করপোরেশন সেখানে পানি দিয়ে ধুলা কমানোর চেষ্টা করছে। মূল কথা হচ্ছে- আমরা সমাধান জানি, এর বাস্তবায়ন আমাদের ঘটাতে হবে। অবশ্যই ঢাকার অবস্থা সব থেকে খারাপ। এর কারণগুলো জানা থাকলে তা সমাধান সম্ভব।
প্রথমত, আমার অভিযোগ হচ্ছে- নির্মাণসামগ্রীর অব্যবস্থাপনা। দেশ বড় হচ্ছে, মানুষের অবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে, ভবন নির্মাণ প্রয়োজন, বাড়িঘর নির্মাণ প্রয়োজন, রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রয়োজন। এ কাজে বালু, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার হয়। এগুলোকে আমরা যথাযথভাবে ঢেকে রাখি না। সামান্য বাতাসেই এগুলো থেকে প্রচুর ধুলা ওড়ে। এখন এই ধুলার দুটি আকার আছে- একটি হচ্ছে ১০ মাইক্রো (অর্থাৎ ১০ লাখ ভাগের ১০ ভাগ), আরেকটি হচ্ছে ২ দশমিক ৫ মাইক্রো। এ মাইক্রো আমরা খালি চোখে দেখি না। এ সূক্ষ্ম বালুকণা যদি শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে, সেখানে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এটা খুব সহজেই অর্জন করা যায়। যেখানে রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে, সেখানে মাটি শুকাতে দেওয়া যাবে না। পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। যেখানে বালু রাখা আছে, বালুটাকে ভিজিয়ে রাখলেই হলো। যেখানে ইট স্তূপ করে রাখা আছে, সেটাকে ভিজিয়ে রাখলেই এই ক্ষুদ্র ধূলিকণার উৎপত্তি হয় না। সরকারি নির্মাণকাজ, বেসরকারি নির্মাণকাজ বা ব্যক্তিগত নির্মাণকাজ- যারা করছেন তারা একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
আমাদের দেশে সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। গুলশান, বারিধারা, বনানীতে থাকেন শহরের উচ্চবিত্তদের একটা অংশ। তাদের কি পরিকল্পিত স্যানিটারি সিস্টেম আছে? নেই। একটি উন্নত এলাকায় যদি এ অবস্থা হয় তাহলে অপেক্ষাকৃত কম উন্নত এলাকার কী অবস্থা তা সহজেই অনুমান করা যায়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে শহরের নদীগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে নদীদূষণ হয় দুইভাবে। এক. সরকারি সংস্থা, দুই. বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ঢাকা শহরের নদীর ৯০ ভাগই অকেজো হয়ে আছে। এর জন্য সরকারি সংস্থা, ওয়াসা, বিভাগীয় শহরগুলোর সরকারি সংস্থা দায়ী। তাছাড়া আমাদের কলকারখানার বর্জ্যের কোনো সুষ্ঠুব্যবস্থাপনা নেই। যত্রতত্র লিকুইড বর্জ্য ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার কথা যদি বলি- ইতোমধ্যে সার্ভে করে কোন পয়েন্ট থেকে বর্জ্য নিষ্কাশিত হয়, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধে যদি আইন প্রয়োগ করা হয় কিংবা শিল্পপতিরা যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগুলো ঠিক করে, তাহলে এ থেকে উদ্ধার হওয়া সম্ভব। আমাদের দেশে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজগুলো চেষ্টা করছে, কিন্তু হচ্ছে না। অথচ লেবার ইন্ডাস্ট্রি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আমি মনে করি, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে যদি আমাদের লেবার ইন্ডাস্ট্রিগুলো ঠিকমতো পরিশোধনের কাজ না করে তাহলে তাদের নিজেদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে। যে কয়টা লেবার কোম্পানি বর্জ্যব্যবস্থাপনাসহ কারখানা অপারেট করে সেগুলো রপ্তানি করতে পারছে। বাকিগুলো পারছে না কেন? মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টা কোম্পানি পারে। ৩০০ থেকে ৪০০ কারখানা পারে না। শুধু এই বর্জ্য ফেলে নদীদূষণের কারণে দেশবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদেশি আমদানিকারকরা বলছেন, তোমরা যদি ক্লিন না কর, তাহলে তোমাদের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করে দেব। কাজেই এটাকে সিরিয়াসলি নিতে হবে। এর জন্য পর্যাপ্ত আইন আছে। শুধু আইন থাকলেই তো হবে না, তার প্রয়োগ থাকতে হবে। এ প্রয়োগ নেই। এ প্রয়োগটা সরকারি-বেসরকারি উভয়কেই করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণে এনে কীভাবে পরিবেশসম্মতভাবে জনজীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলা যায়, তার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকে। সে অনুযায়ী দেশের ভেতরেও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করি। কিন্তু বাস্তবায়ন করি না। ইউরোপের অনেক দেশ একসময় গাছপালা কেটে, বন উজাড় করে একটা বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। তাদের বড় নদীগুলো ছোট হয়ে গিয়েছিল। তারা সেগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পূর্বাবস্থায় ফিরে গেছে। তারা শব্দদূষণ, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। পৃথিবীতে যথেষ্ট নজির আছে। আমাদের আইন আছে, পলিসি আছে, কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। এখন আমাদের বাস্তবায়নের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য তা জরুরি।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়


.jpg)