লাখ লাখ জনতার উদগ্রীব ও উত্তেজনার মধ্যে রক্তভেজা স্বাধীন ও সার্বভৌম স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন বঙ্গবন্ধু। কানায় কানায় পরিপূর্ণ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রত্যাবর্তন ভাষণে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানে আমি ফাঁসিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবে...‘বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে।...
তার স্বদেশে ফিরে আসা নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম। কয়েকটি চরণ: ‘২৮৮ দিন পর.../ ওরা তোমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে/ তুমি পরাজিত শত্রুদের পাঁজর ভেঙে দিয়ে/ স্বপ্নহীন এক অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্ত হয়ে/ উড়াল দিয়েছো প্রিয় স্বপ্নভূমি স্বদেশের দিকে..।’ উল্লিখিত কবিতার চরণগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েই কথা শুরু করি। ২৮৮ দিন মানে—২৫ মার্চ ১৯৭১ থেকে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২। ওরা মানে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা, তোমাকে মানে---বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার মহান রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তুমি মানে—তিনি, বাঙালির ভাগ্যদাতা বঙ্গবন্ধু। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি বা বর্বর বাহিনী, যারা তাকে তার ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি করে। কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে অর্থাৎ মৃত্যুকূপে রেখে দিয়েছিল, পরের চরণ দুটি রিপিট করি—‘স্বপ্নহীন এক অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্ত হয়ে/ উড়াল দিয়েছো প্রিয় স্বপ্নভূমি স্বদেশের দিকে...’। যে স্বপ্নভূমি বাংলাদেশ তার জন্য অপেক্ষা ও প্রতীক্ষা করেছিল। কেমন ছিল সেই আনন্দাশ্রু চোখের উদ্ভাসিত মুখ, কেমনইবা ছিল প্রতীক্ষার পূর্ব দিগন্তের আলো, বিকেলের বৃক্ষের পাতা ঝরা মুক্ত ভৌগোলিক বাংলাদেশ? আসুন ওই দিনের চোখে চোখ রাখি।
দিনটির নাম ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক বিরাণভূমি আর পুড়ে যাওয়া ২৬ হাজার বর্গমাইলের ধূসর ও সদ্য স্বাধীন এবং রক্তস্নাত বাংলাদেশ। সহস্র ক্ষত, দুঃখ আর বেদানাক্রান্ত সমুদ্র ঢেউ থেকে বেরিয়ে আসা স্বজন হারানো ৭ কোটি মানুষ অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে হিমালয়সম একজন মানবতাবাদী মানুষকে গ্রহণ করার জন্য। মানুষটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীর শাখা স্রোতস্বিনী বাইগার তীরবর্তী অজপাড়া গাঁও টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া খোকা নামের ছোট্ট শিশু, যিনি ধীরে ধীরে খোকা থেকে শেখ মুজিব, শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে উঠেছিলেন। সেই স্কুলবেলা, কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নকালেই প্রতিবাদী, ন্যায়ের পক্ষে লড়াই এবং মানুষের পক্ষে কাজ করার দারুণ অভিপ্রায়, অভিলাষ অর্থাৎ মানবতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি খেলাধুলা করতেন, বন্ধুদের নিয়ে গাছ থেকে ফল পেড়ে খেতেন, স্কুলের যে সহপাঠী বইয়ের জন্য ক্লাসে মার খেত, তাকে নিজের বই দিয়ে দিতেন, গরিব ছাত্রদের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল সংগ্রহ করে সেগুলো বিক্রি করে তাদের বইপুস্তক কিনে দিতেন, ক্লাসে তিনি ক্যাপ্টেন ছিলেন, স্কুলের ছাদ চুয়ে পানি পড়ে, সেটি অভিযোগ করে স্কুল পরিদর্শনে আসা শেরে-ই-বাংলা ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে মেরামত করে দেওয়ার জন্য আবেদন করেন, ১৯৩৯ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় প্রথম ১৯ বছর বয়সে তিনি কারাবরণ করেন। এরপর কলকাতায় গিয়ে ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। এরই মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন। তার আত্মজীবনীতে আছে—১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা থামানোর জন্য তিনি সন্ধ্যাবেলা তার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যান এবং দাঙ্গা বন্ধে প্রচেষ্টা নেন। এই সময়েই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে, বঙ্গবন্ধু তার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেন। এ সময় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। একই বছর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করেন এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে সমর্থন দেন এবং এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে। একই বছরের ২৩ জুন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয় এবং তিনি যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি জেল থেকে মুক্তি পান এবং ঢাকার রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সব বিরোধী দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে বিশাল বিজয় লাভ করে। ২ এপ্রিল মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। ওই বছর ১৪ মে শেখ মুজিবুর রহমান কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন। ৩০ মে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। ১৯৫৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরের ১৭ জুন তিনি পল্টনের জনসভায় পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। তিনি নবগঠিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল’ জারি হয়। আবারও গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬২ সালের ২ জুন সামরিক শাসনের অবসানের পর জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সর্বদলীয় অপোজিশন পার্টি গঠন করা হয়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা সনদ ঘোষণা করে। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি হন তিনি। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়। একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ ও ডাকসু কর্তৃক রেসকোর্সের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয় হয়। এরপর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন এবং ভাষণের শেষ বাক্যগুলো ছিল—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম—জয়বাংলা’। এরপর ২৫ মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের নামে গণহত্যা শুরু করে। সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায় একটি অসম জনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহিদ ও ২ লাখেরও অধিক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করে বাঙালি।
যুদ্ধের পুরো সময় তিনি পাকিস্তানি কারাগারে ছিলেন। তাকে কারাগারে কনডেম সেলে রাখা হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও বলব আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা’। এই মৃত্যুভয়হীন সাহসী ও বাঙালি প্রাণপুরুষ মুজিবকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ফাঁসি দিতে পারেনি—বিশ্ব বিবেকের চাপে। এদিকে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। তাকে পাকিস্তান মুক্ত করে দিতে বাধ্য হয়। তিনি ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে লন্ডনে যান, বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হিথ তাকে নজিরবিহীন সম্মান দেখান।
১০ জানুয়ারি বিকেল। তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে লাখ লাখ জনতার উদগ্রীব ও উত্তেজনার মধ্যে রক্তভেজা স্বাধীন ও সার্বভৌম স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন বঙ্গবন্ধু। তার চোখে আনন্দাশ্রু, অন্যদিকে আনন্দাশ্রু নিয়ে তাকে স্বাগত জানালেন তারই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচরসহ অসংখ্য অসংখ্য মুজিবভক্ত। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে গেলেন তিনি, তখন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে জয় বাংলা স্লোগান মুখরিত করে লক্ষ-কোটি মুক্ত স্বাধীন বাঙালি প্রিয় নেতাকে বরণ করে নিচ্ছেন। কানায় কানায় পরিপূর্ণ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রত্যাবর্তন ভাষণে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানে আমি ফাঁসিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবে...‘বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে। খেয়ে-পেয়ে সুখে থাকবে এটাই আমার সাধনা’। কবিগুরুর ৭ কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি...’। কবিতাংশের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কবিগুরুর আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি...বাঙালি জাতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা প্রাণ দিতে জানে। এমন কাজ তারা এবার করেছে যার নজির ইতিহাসে নেই’। তারপর তিনি গেলেন তার প্রিয় বত্রিশে। ১০ জানুয়ারি তাই বাঙালিদের এক আনন্দময় অবিস্মরণীয় দিন। কারণ বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখেনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি’। কবি শামসুর রাহমান তাকে নিয়ে লিখেছেন, ‘ধন্য সেই পুরুষ নদীর সাঁতার পানি থেকে যে উঠে আসে/....ধন্য আমরা, দেখতে পাই দূরদিগন্ত থেকে এখনো তুমি আসো,/আর তোমারই প্রতীক্ষায়/ ব্যাকুল আমাদের প্রাণ, যেন গ্রীষ্মকাতর হরিণ/ জলধারার জন্যে। তোমার বুক ফুঁড়ে অহংকারের মতো/...ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পতাকার মতো/ দুলতে থাকে স্বাধীনতা,/ ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর ঝরে/ মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি’। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ধন্য হয়েছে বাংলাদেশ। মুজিব চিরঞ্জীব।
লেখক: কবি
.jpg)
.jpg)
.jpg)