গণতন্ত্রের অন্যতম মূলনীতি হলো মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা। সুতরাং, এমন কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন করা যুক্তিসংগত নয়, যা নাগরিকদের মনে আঘাত হানে বা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। বাস্তবতা হলো, আমরা যত আইনই করি, যত কাঠামোগত সংস্কারই আনি না কেন- যদি নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায় পরিবর্তন না আসে, তাহলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
দেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- এটি আমাদের সবার প্রত্যাশা। এটি শুধু একটি প্রত্যাশা নয়; বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। নির্বাচনকে ঘিরে জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা- এই তিনের সমন্বয়েই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হয়। বাস্তবতা হলো, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নির্বাচন ও গণতন্ত্র- এ দুটি ধারণা গভীর সংকটের মধ্যদিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, তথাকথিত উন্নত ও গণতন্ত্রের ‘রোল মডেল’ রাষ্ট্রগুলোও এ সংকট থেকে মুক্ত নয়।
বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, মেরুকরণ ও অবিশ্বাস ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গণতন্ত্র সূচকে উচ্চ অবস্থানে থাকা দেশগুলোতেও নির্বাচনি প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অর্থাৎ, নির্বাচন এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ক্ষমতা ধরে রাখার বা ক্ষমতায় যাওয়ার একটি কৌশলগত লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
কয়েক বছর আগে গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণা উপস্থাপনের সুযোগ হয়েছিল থাইল্যান্ডের রাজাভাট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত গবেষকরা গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলব্যবস্থার ওপর তাদের গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গণতন্ত্র এবং নির্বাচন। কনফারেন্সটিতে বেশির ভাগ গবেষকের আলোচনায় উঠে আসে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক আকর্ষণ থাকলেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক রাষ্ট্রেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে নির্বাচন জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত করতে পারছে না।
সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এ সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দুই মাসব্যাপী আগাম ভোট গ্রহণ চলাকালে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ওরেগন ও ওয়াশিংটনে ব্যালট ড্রপ বাক্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েক শ ভোট নষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এ ঘটনাগুলোকে পরস্পর সংযুক্ত বলে মনে করেছে। ওয়াশিংটনের ক্লার্ক কাউন্টির নির্বাচিত নিরীক্ষক গ্রেগ কিমসি একে ‘গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রও আজ নিরাপদ নয়।
এর আগেও আমরা দেখেছি, ২০২০ সালের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, ক্যাপিটল হিল হামলা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করার প্রবণতা। যেসব দেশ গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করে, অন্য রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড শেখায়- সেখানেই যদি নির্বাচন নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বৈশ্বিক নির্বাচনি গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াই স্বাভাবিক।
বিশ্বের বহু দেশে একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষ করা যায়- ক্ষমতাসীন দল যদি আশঙ্কা করে যে, অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন নির্বাচনে তারা পরাজিত হতে পারে, তাহলে তারা প্রকাশ্যে বা গোপনে ভয়ভীতি, সহিংসতা কিংবা আইনি কৌশলের আশ্রয় নেয়। নির্বাচনি আইন সংশোধন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দলের ওপর দমনমূলক ব্যবস্থা- এসবই ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মিতভাবে নির্বাচনি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, বাস্তবে সে সংস্কার অধিকাংশ সময়ই ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, বর্তমান বিশ্বে নির্বাচন আদৌ কতটুকু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে? নির্বাচন কি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে, নাকি এটি এখনো গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হিসেবে টিকে আছে? বাস্তবতা হলো, নির্বাচনি গণতন্ত্র এমন একটি প্রক্রিয়া, যা হাতেনাতে ধরা যায় না; এটি নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সহনশীলতা এবং নাগরিক মানসিকতার ওপর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ আলোচনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা প্রায়ই হতাশ হই যখন দেখি রাজনৈতিক নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ চর্চা শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, আইন করে কি এই কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করা সম্ভব? উত্তর স্পষ্ট- না। আইন সহায়ক হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও নৈতিকতার বিকল্প হতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে আমরা দেখি, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা একে অপরের ব্যক্তিগত জীবন, অতীত এবং গোপন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্য আক্রমণ করেন। তার পরও সেখানে একটি সহনশীলতার সীমারেখা বিদ্যমান থাকে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলের ভেতরের গণতন্ত্র। প্রাথমিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং নির্বাচনের পর প্রতিদ্বন্দ্বীকে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি- এসবই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক।
বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে হিলারি ক্লিনটনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং গণতান্ত্রিক উদারতার একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদেরই নিজেদের পথের কাঁটা না হওয়া। ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষা যদি শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও নাগরিক মর্যাদাকে উপেক্ষা করে, তাহলে তা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়। জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য ও আচরণে সংযম থাকা জরুরি, কারণ তারা কেবল দলীয় প্রতিনিধিই নন, তারা নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি।
তাছাড়া, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকার প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের ধারণা ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু এমন ধারণা আদৌ বাস্তবসম্মত কি না তা একটি বিতর্ক। যদি রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা ও জবাবদিহির মানসিকতা পরিবর্তিত না হয়, তাহলে গণভোটের ফলাফলে হ্যাঁ বিজয়ী হয়েও দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক বিতর্ক ও অস্থিরতার চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব হবে না। অতএব, গণভোট সমাধানের অংশ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়।
গণতন্ত্রের অন্যতম মূলনীতি হলো মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা। সুতরাং, এমন কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন করা যুক্তিসংগত নয়, যা নাগরিকদের মনে আঘাত হানে বা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। বাস্তবতা হলো, আমরা যত আইনই করি, যত কাঠামোগত সংস্কারই আনি না কেন- যদি নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায় পরিবর্তন না আসে, তাহলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
অতএব, আদর্শ নির্বাচনের অনুসন্ধান মানে কেবল একটি ভালো নির্বাচনি কাঠামো খোঁজা নয়; বরং একটি পরিশীলিত রাজনৈতিক মানসিকতা, সহনশীল সংস্কৃতি এবং দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ গড়ে তোলা। মানসিকতার এ পরিবর্তনের মধ্যদিয়েই কেবল একটি গ্রহণযোগ্য, উদার ও টেকসই নির্বাচনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


.jpg)