বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জনসংখ্যার ঘনত্ব, চিকিৎসকসংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা। একবিংশ শতাব্দীতে স্বাস্থ্যসেবা আর কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারে সীমাবদ্ধ নেই। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে ‘ডিজিটাল হেলথ’ একটি বৈশ্বিক বাস্তবায়তায় পরিণত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ডিজিটাল হেলথকে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন এবং দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল হেলথ এখন এক অপরিহার্য মাধ্যম।
ডিজিটাল হেলথের প্রয়োজনীয়তা কেন?
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসক ও রোগীর ভারসাম্যহীন অনুপাত এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। দেশে প্রতি ১,২০৫ জন মানুষের বিপরীতে মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষ চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। এ শূন্যতা পূরণে ডিজিটাল হেলথ অত্যন্ত জরুরি।
গ্রাম-শহরে স্বাস্থ্যবৈষম্য হ্রাস: গ্রামাঞ্চলের মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা বা রাজধানীতে যেতে হয়, যা সময় ও অর্থ উভয় দিক থেকেই ব্যয়বহুল। মোবাইল ফোনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, ভিডিও কনসালটেশন ও ডিজিটাল রিপোর্টিং এ বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি: ডিজিটাল হেলথ সিস্টেমে ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (EHR) ব্যবহারের ফলে রোগীর আগের ইতিহাস সহজে পাওয়া যায়। এতে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমে, শহরে যাতায়াত ব্যয় কমে, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত দ্রুত হয় এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাস পায়।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল অ্যাপ এবং রিমোট মনিটরিং সিস্টেম রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ ও জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
জরুরি পরিস্থিতি ও মহামারি মোকাবিলা: কোভিড-১৯ মহামারি দেখিয়েছে, ডিজিটাল হেলথ ছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলা প্রায় অসম্ভব। ডিজিটাল সার্ভেইলেন্স, অনলাইন কনসালটেশন, ভ্যাকসিন ট্র্যাকিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্স মহামারি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ডিজিটাল হেলথের বর্তমান অগ্রগতি
গত এক দশকে বাংলাদেশে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার এক অভূতপূর্ব নীরব বিপ্লব ঘটেছে। সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতেই এর প্রভাব দৃশ্যমান।
সরকারি উদ্যোগ: বিগত সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলায় টেলিমেডিসিন সেবা চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বাতায়ন (১৬২৬৩)-এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি খাতের বিকাশ: ‘প্রাভা হেলথ, সুখী, আরোগ্যর মতো স্টার্টআপগুলো বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাকে অ্যাপভিত্তিক করে তুলেছে। ভিডিও কলের মাধ্যমে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলা, ই-প্রেসক্রিপশন এবং ঘরে বসে ল্যাব টেস্টের সুবিধা এখন শহরের গণ্ডি পেরিয়ে মফস্বলেও জনপ্রিয় হচ্ছে।
শরীরে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ব্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে হার্ট রেট, অক্সিজেন স্যাচুরেশন এবং ঘুমের মান পর্যবেক্ষণ করার প্রবণতা বাড়ছে, যা মূলত প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ারের অংশ।
আগামীর ভবিষ্যৎ: স্মার্ট হেলথকেয়ার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থা হবে পুরোপুরি ডেটানির্ভর এবং ব্যক্তিগত। বাংলাদেশে আগামীতে আমরা নিচের পরিবর্তনগুলো দেখতে পাব।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) : এক্স-রে, এমআরআই বা সিটি স্ক্যান রিপোর্ট বিশ্লেষণে এআই-এর ব্যবহার রোগনির্ণয়কে আরও নির্ভুল ও দ্রুত করবে। ক্যানসারের মতো রোগ প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা সহজ হবে।
স্মার্ট হেলথ কার্ড: জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো প্রতিটি নাগরিকের একটি ‘ইউনিক হেলথ আইডি’ থাকবে। একজন রোগী যে হাসপাতালেই যান না কেন, চিকিৎসকরা এক ক্লিকেই তার আগের সব রোগ ও ওষুধের ইতিহাস জানতে পারবেন।
আইওটি (IoT) ও রিমোট মনিটরিং: ক্রনিক রোগী যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের শরীরে সেন্সর লাগানো থাকবে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক বা স্বজনদের কাছে অ্যালার্ট চলে যাবে।
স্বাস্থ্য খাতে কর্মসংস্থান ও স্টার্টআপ: ডিজিটাল হেলথ নতুন প্রজন্মের জন্য হেলথ-আইটি, ডেটা সায়েন্স, হেলথকেয়ার ম্যানেজমেন্ট ও স্টার্টআপ খাতে বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ
সম্ভাবনা থাকলেও ডিজিটাল হেলথ বাস্তবায়নের কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ: তৃণমূল পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব।
প্রশিক্ষণ: চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তথ্যের সুরক্ষা: রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষ ডিজিটাল সেবায় ভরসা পাবে না।
ডিজিটাল লিটারেসি: অনেক বয়স্ক রোগী বা প্রান্তিক মানুষ অ্যাপ ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
সরকারকে একটি শক্তিশালী ‘ডিজিটাল হেলথ পলিসি’ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ডিজিটাল বুথ স্থাপনের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে হবে এবং স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি স্টার্টআপগুলো সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা।
বাংলাদেশে ডিজিটাল হেলথের সম্ভাবনা অসীম। ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়া সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে একজন মানুষও যেন সুচিকিৎসার অভাবে প্রাণ না হারায়। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর মানবিক সেবার মেলবন্ধনেই গড়ে উঠবে সুস্থ-সবল আগামীর বাংলাদেশ।
লেখক: প্রধান ফিন্যান্সিয়াল কর্মকতা (সিএফও), অ্যাডভান্সড এবিসি গ্রুপ
[email protected]
.jpg)
.jpg)
.jpg)