পাঁচ বছর পর পর জনগণের ওপর কারা কর্তৃত্ব করবেন তার সম্মতি দেওয়াই কি তাহলে নির্বাচনের লক্ষ্য হবে? অভ্যুত্থানের পর যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছিল তা ধুসর হয়ে যাবে কি পুরোনো মানসিকতার কাছে।...
প্রচার-প্রচারণার শেষপর্যায়ে এসে এখন সবার প্রশ্ন- নির্বাচনে জিতবে কে? কোনো প্রার্থীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি নির্বাচনে জিতবেন? এর সবচেয়ে ভালো উত্তর হবে যদি তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিলে অবশ্যই জিতব। তখন প্রশ্ন আসে, জনগণ আপনাকে কেন ভোট দেবে? তখন প্রার্থী তার পরিকল্পনা হাজির করেন, তার অতীত দিনের কাজের ফিরিস্তি দেন এবং তিনি জনগণের কথা সবসময় ভেবেছেন এবং ভবিষ্যতেও ভাববেন এ সংকল্প ঘোষণা করেন। এগুলো হচ্ছে নির্বাচনের সময় প্রকাশ্য তৎপরতা। কিন্তু ইতিহাস বলে এটুকুতেই নির্বাচন হয় না, এ ঘোষণা বা তৎপরতাই যথেষ্ট নয়। প্রকাশ্য ঘোষণা ও তৎপরতার বাইরে গোপন ক্রিয়া নির্বাচনে প্রধান ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে প্রতিপক্ষের চরিত্র হনন, ভোটারদের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া, কেন্দ্রে কারসাজি করা এবং শক্তি প্রয়োগ করা অন্যতম। আর এ ক্ষেত্রে টাকা এবং ধর্ম হয়ে পড়ে প্রধান হাতিয়ার। নির্বাচন কমিশন যে ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে হাতেগোনা কয়েকজন প্রার্থী ছাড়া বাকিরা তার তোয়াক্কাই করে না, যে আচরণবিধি ঘোষিত হয়েছে তা লঙ্ঘিত হয় প্রতিদিন। কমিশন দেখে কিন্তু সহ্য করে যায়। এরপর আছে দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তাদের দলের ইশতেহার ঘোষণা।
নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না শক্তিশালী হলে অঙ্গ কি কর্মক্ষম থাকবে? যেমন পক্ষাঘাত হয় মাথায় কিন্তু অচল হয় হাত-পা। তেমনি শাসকদের দমনপীড়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ না কাজ করলে নির্বাচন থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তো দূরের কথা চর্চা করাও মুশকিল। গত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচন তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার শর্ত তৈরি করে। ফলে জনগণ বিশ্বাস করে সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে সম্ভব নয়। অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনমনে তাই জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে, এবারের নির্বাচন কেমন হবে?
নির্বাচনে জয়টাকে সম্ভব করতে অসম্ভব প্রতিশ্রুতি যেমন দিচ্ছে তেমনি নিজেরা যে কত ক্ষমতাধর সেই প্রমাণ করার চেষ্টা করছে প্রার্থীরা। ভাবখানা এই যে, এরকম ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষকে সংসদে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠালে এমন কোনো সমস্যা নেই যা তিনি সমাধান করতে পারবেন না। কেউ বলছেন তার কথায় সূর্য থেমে যায়, কেউ হুংকার দিচ্ছেন তার কথায় থানাকে উঠতে এবং বসতে হবে। কেউ কেউ আবার আরও একধাপ এগিয়ে বেহেশতের টিকিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। হুংকারও দেওয়া হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, কীভাবে পেটের ভেতর থেকে দুর্নীতির টাকা বের করে আনা হবে সে প্রক্রিয়ার কথাও বলছেন কেউ কেউ। ১২ কোটি ৭৮ লাখ ভোটারদের অর্ধেক নারী। তাদের ব্যাপারেও নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। সবমিলে এ যেন এক এলাহি কারবার। সংখ্যা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনের মুখে যখন অর্থনীতি হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্বাসের জায়গা, তখন সেই সংখ্যাগুলোর ওজন বাড়ে কয়েক গুণ। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা, জনগণের জন্য নেওয়া কর্মসূচি নিয়ে কাগজে-কলমে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেখলে মনে হতে পারে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই উন্নয়নের উচ্চতম ধাপে পা রাখতে চলেছে। এ অঙ্কগুলো কি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে, নাকি আগের মতোই ভোটের আগের পরিচিত সংখ্যার রাজনীতি? বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এ অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো প্রশ্ন তৈরি করে। যে কথা লেখার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছিল, নির্বাচনে কে জিতবেন? কীভাবে তা নির্ধারিত হবে? প্রার্থী জিতলে কী করবেন এবং কীভাবে করবেন- এসব প্রশ্ন এবং তার উত্তর পেয়ে জনগণ সন্তুষ্ট হলে কি ভোট দেবেন? এর মধ্যদিয়েই কী জনমত তৈরি হবে? নাকি টাকা, পেশিশক্তি, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার আর প্রশাসনের খবরদারি দ্বারা নির্বাচন প্রভাবিত হবে- এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যাচ্ছে প্রতিজ্ঞা এবং জাবাবদিহি। মানুষের মধ্যে সে চেতনা জাগিয়ে তোলাই নির্বাচনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু যখন ক্ষমতা দখল প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় আর ক্ষমতা মানে সবকিছু ভোগ করার অবাধ সুযোগ, তখন হারিয়ে যায় নীতি আর ঔচিত্যবোধ।
যখন শ্রমের বাজারে শ্রমিক পণ্য, ভোটের বাজারে ভোটার পণ্য তখন প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায় কি দল বা প্রার্থীর থাকে? অতীত নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায় কেউ নেয়নি। পাঁচ বছর পর পর জনগণের ওপর কারা কর্তৃত্ব করবেন তার সম্মতি দেওয়াই কি তাহলে নির্বাচনের লক্ষ্য হবে? অভ্যুত্থানের পর যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছিল তা ধুসর হয়ে যাবে কি পুরোনো মানসিকতার কাছে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর প্রতিশ্রুতি পালন না করার সেই পুরোনো বৃত্তে থাকলে নির্বাচনে যেই বিজয়ী হোক না কেন, হেরে যাবে জনগণের গণতান্ত্রিক সমাজের আকাঙ্ক্ষা।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
