সুতরাং, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্র তার এ দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ ভয়াবহ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা রোধে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ- সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যথাযথ তদারকি, কঠোর জবাবদিহি এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে নিরাপদ গ্যাস ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি।...

জ্বালানি মানবজীবনের জন্য একটি আবশ্যিক পণ্য বা সেবা। জ্বালানি তথা জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যেকোনো মৌলিক চাহিদার (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা চিকিৎসা, বাসস্থান) ঘাটতি যতটা না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানি ঘাটতি অত্যধিক ভয়াবহ বিপজ্জনক। অতীতে জ্বালানি খাত পরিচালনা ও উন্নয়নে যেসব নীতিকৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, তাতে জ্বালানি নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে। সঠিক তথা ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যহারে ভোক্তার জন্য বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাথমিক জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসপ্রাপ্তির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সিলিন্ডার বা রেগুলেটরে লিক আছে কি না তা নিয়মিত সাবান পানি দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কখনোই আগুন জ্বালিয়ে লিক পরীক্ষা করা যাবে না। সরকার অনুমোদিত কোম্পানির সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ বা মরিচা ধরা সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ। সিলিন্ডার সব সময় সোজা করে খোলা ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে রাখতে হবে। চুলার খুব কাছে বা সরাসরি রোদে রাখা যাবে না। গ্যাসের পাইপ পুরোনো বা ফাটা হলে দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে এবং মানসম্মত রেগুলেটর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা (সেফটি) ও সুরক্ষা (সিকিউরিটি) নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব গ্যাস বিক্রেতাদের। যারা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করেন, তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা বিষয়ে একাডেমিক জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। শুধু ব্যবসা করলেই চলবে না- তাদের সাধারণ মানুষকে সঠিক ব্যবহারবিধি, ঝুঁকি ও করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। না পারলে এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার নৈতিক অধিকার তাদের থাকা উচিত নয়। সিটি করপোরেশনকে তদারকি করতে হবে। এটা খুব জরুরি।
দেশের জ্বালানি তথা গ্যাস-কয়লা রপ্তানি দেশের মানুষ জীবন ও রক্ত দিয়ে প্রতিহত করলেও সে সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে বিগত সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরল জ্বালানি ও কয়লা আমদানির প্রতিই বেশি আগ্রহী হয়। এমন আগ্রহ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০-এর আওতায় বিগত সরকারের আমলে প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ একদিকে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। অন্যদিকে সরবরাহ ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধিতে সরকারি ভর্তুকি ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
আগে জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করা হতো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইনের আওতায় বিইআরসি দ্বারা গণশুনানির ভিত্তিতে। এতে অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতো। কিন্তু বিইআরসি আইন লঙ্ঘন করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নিজেই অংশীজনদের অংশগ্রহণ ব্যতীত তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করা অব্যাহত রাখে। ফলে তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ সম্পর্কিত তিনটি প্রবিধানমালা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক ২০১২ সাল থেকে আটকে রাখার বিরুদ্ধে এবং ৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখে তরল জ্বালানির (ডিজেল ও কেরোসিন) কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে নির্ধারিত মূল্যহার বিইআরসি আইনের ধারা ২২ ও ৩৪ অনুযায়ী রিভিউয়ের আদেশ প্রদানের জন্য ক্যাবের দায়েরকৃত ১০৫০৮/২০২১ নম্বর রিট মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট রুলনিশি ইস্যু করেন। মামলাটি এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০২৩-এর দ্বারা সরকার তথা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা হাতে নেয়। ওই সংশোধিত আইনে ধারা ৩৪ক সংযোজনের মাধ্যমে সরকার মূল্যহার নির্ধারণের ওই ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেই সঙ্গে ‘কমিশন কর্তৃক প্রবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সরকার এনার্জির মূল্যহার নির্ধারণ করিতে পারিবে’- এ কথাও সংশোধনীতে সংযোজন করা হয়। বর্তমান সরকার আধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ওই সংশোধনের শুধু ধারা ৩৪ক রহিত করে এবং তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের হাতেই রয়ে যায়।
বিগত সরকার কর্তৃক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ-২০২৪ জারি করায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০ রহিত হয়। তবে অধ্যাদেশে দফা ২(২)(ক) ও (খ) সংযোজন করে ওই আইনের আওতায় সব কার্যক্রমের আইনি বৈধতা দিয়ে সুরক্ষা তথা দায়মুক্তি দেওয়ায় বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় অব্যাহত অবাধ লুণ্ঠন এ সরকারের আমলে সুরক্ষা পেল। ভোক্তারা জ্বালানি সুবিচার বঞ্চিত হলো। ফলে রহিতকরণ অধ্যাদেশে সংযোজিত দফা ২(২)(ক) ও (খ) বাতিলের জন্য ক্যাব হাইকোর্টে ১৫১৬১/২০২৪ নম্বর রিট মামলা দায়ের করেছে।
জ্বালানি আমদানি, অনুসন্ধান ও উৎপাদন বিষয়ক ব্যয়ের ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার ক্ষমতা আইনে বিইআরসিকে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যতীত সম্পূর্ণ সাপ্লাই চেইন রেগুলেটরি সংস্থা বিইআরসির আওতাবহির্ভূত। ভোক্তার জ্বালানি অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষণ নিশ্চিত হতে হলে সমগ্র সাপ্লাই-চেইন বিইআরসির আওতায় আনা আবশ্যক। তাই ক্যাবের প্রস্তাবিত জ্বালানি নীতিতে বিইআরসি আইন সংস্কার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পৃথিবীর জ্বালানির প্রায় সর্বাংশের উৎস সূর্য হলেও পৃথিবীজুড়েই ভূমি ও সাগরের অভ্যন্তরে যে পরিপূরক জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তার মালিকানা রাষ্ট্র তথা জনগণের। কিন্তু যারা বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি সম্পদ জনগণের নামে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও সমর্থনে লেনদেন করেছেন, তারা জনগণের অধিকার খর্ব করে কতিপয় দুর্ভেদ্য অধিকার বা অলিগার্ক সৃষ্টি করেন। এ অবস্থার পরিবর্তন করা দরকার সবার আগে। অধ্যাদেশে সংযোজিত ওই দফা ২(২)(ক) ও (খ) বাতিল না হলে এ পরিবর্তন হবে কীভাবে? অতীত লুণ্ঠনের বিচার না হলে আগামীতে জ্বালানি খাত লুণ্ঠনমুক্ত হবে কীভাবে? ক্যাব সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালের দ্বারা বিগত ১৫ বছরের লুণ্ঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত সুনির্দিষ্ট চারজন বিশিষ্ট অপরাধীসহ সব জ্বালানি অপরাধীদের বিচার চায়। লুণ্ঠনমুক্ত জ্বালানি খাত উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্যাব বিইআরসি আইনের আমূল সংস্কার চায় এবং ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪-এর ভিত্তিতে বাণিজ্যিক নয়, সরকারি সেবা খাত হিসেবে জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য জাতীয় জ্বালানি নীতি চায়।
সুতরাং, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্র তার এ দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ ভয়াবহ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা রোধে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ- সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যথাযথ তদারকি, কঠোর জবাবদিহি এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে নিরাপদ গ্যাস ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি। সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
লেখক: অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও জ্বালানি উপদেষ্টা

